About Me

My photo
Kolkata, West Bengal, India

Saturday, 26 March 2022

সহযাত্রা

কদিন ধরে সাবিনাকে বোধহয় একটু বেশিই নজর করছে বুলি। বড় সুন্দর গায়ের রঙ সাবিনার । কাঁচা হলুদের মত। তার উপর সরু সরু কালো রঙের আঁচড়। যেন খুব সরু তুলি দিয়ে দেওয়া শিল্পীর নিখুঁত টান। বুলি খুব মন দিয়ে দেখার চেষ্টা করে সাবিনাকে। খুব চঞ্চল স্বভাব তার। গলার আওয়াজটাও ভীষণ মধুর। মাথাটা আকাশের দিকে তুলে সুরেলা গলায় যখন গান ধরে, বুলি তাকিয়ে থাকে সাবিনার চোখের দিকে। কি দৃপ্ত, গভীর চোখ। যেন অনেক কিছু বলতে চায়। বুলি মনে মনে ভাবে সাবিনার সাথে বন্ধুত্ব হলে বেশ হত।
        সেদিন আকাশটা কেমন ঘোলাটে।  উপর থেকে বুলি দেখছিল সাবিনার রঙের বাহার। যেন সদ্যফোটা সূর্য্যমুখী। সোনার বরণ শরীরটাতে চিরবসন্তের আবেশ। আলতো সুরে গান ধরেছে সাবিনা। সুরের ভাঁজে মাথা উপরে তুলতেই দুজনের চোখাচোখি।  বিস্ময়, জিজ্ঞাসা কৌতুহল সব মিলিয়ে একদৃষ্টে বুলি তাকিয়ে আছে সাবিনার দিকে। সাবিনা উদাত্ত কন্ঠে গান গেয়ে চলেছে, আকাশে বাতাসে ছড়িয়েছে সুরের রামধনু।
       মন্ত্রমুগ্ধের মত সাবিনার গান শুনতে শুনতে আর আপন করে তাকে পাওয়ার স্বপ্ন দেখতে দেখতে গোটা দুই বসন্ত পার করে দিল বুলি। বুলির মনের অলিতে গলিতে সাবিনার আনাগোনা। সাবিনা  সকলের থেকে একটু আলাদা। কার কি হল, কার হল না, কার কি চাওয়া, কার কিসে অসন্তোষ এসব কোন কিছুতেই কোন আগ্রহ নেই তার। নিরাসক্ত সাবিনার এই উদাসীনতাই চুম্বকের মত আকর্ষণ করে বুলিকে। বুলির স্বপ্নের রাজপ্রাসাদে সাবিনার রাজকীয় অবস্থান। সাবিনা তার বিন্দুবিসর্গও জানেনা। জানার কোন প্রয়োজনও মনে করে না। সারা দিন নিজের কাজ সেরে দিনান্তে নিজের ছোট্ট বাসায় ফিরে যাওয়া আর সময়ে সময়ে চারিদিক মাতিয়ে দেওয়া সুরের মৌতাত, এই হল সাবিনার রোজনামচা। 
       সবুজের রঙ্গমঞ্চে বুলি একটু বেমানান। চোখে পড়ার মত গায়ের রঙ নয় তার, গলায় নেই মাতিয়ে দেওয়ার মত সুরের ঝংকার। চোখের চাউনিতে নেই কোন মাদকতা, চলনবলনে নজর কাড়ার মত বিশেষ কিছুই নেই। নামের সাথে সঙ্গতি রেখে বুলির ভাবগতিক কিছুটা সিপাই এর মতই। তবে আপাত কঠিন হলেও বুলির একটা সুন্দর মন আছে। যে মন স্বপ্ন দেখতে জানে। সুন্দর একটা পৃথিবীর স্বপ্ন। যে পৃথিবীতে আছে বিশ্বাস, নির্ভরতা, আর নি:স্বার্থ ভালোবাসা। কিন্তু বুলির সেই স্বপ্নালু মন বোঝার মত বন্ধু যে তার নেই! সাবিনাকে দেখার পর থেকে এমন এক বন্ধু পাওয়ার ইচ্ছেটা খুব বেড়ে গিয়েছে বুলির।
      কোন এক অলৌকিক সংযোগে বুলি আর সাবিনার একটা সম্পর্ক হয়েই গেল। সারাদিন সুরের হিল্লোল তোলা গানের রাণী সাবিনা হঠাৎ একদিন আবিস্কার করল, বুলির গলাতেও সুর আছে। একটু অন্যরকম বটে তবে শুনে কানে আঙুল দিতে হয় না। গানে গানে এক প্রাণের বাঁধনে জড়িয়ে গেল দুজনে। ভালোবাসার টানে দুজনে করে বসল আমরণ সঙ্গলাভের অঙ্গীকার। 
       খেয়ে মেখে বেঁচে থাকার তাগিদে সারাদিন সবুজাঙ্গনের এক প্রান্ত থেকে আর এক প্রান্তে ঘুরে বেড়ায় দুজনে। দিনান্তে বাসায় ফেরার আগে কোনদিন একবার চোখের দেখা হয় কখনো বা তাও হয় না। সিপাই প্রকৃতির হওয়ার জন্য সবুজাঙ্গনে বুলির বেশ খানিকটা প্রভাব আছে। সেখানকার নিয়মবিধি তৈরী থেকে তার ঠিকঠাক পরিচালনার ভার অনেকটাই বুলির হাতে। ছোট্ট বুলির এই কঠোর অনুশাসনে অনেকেই তাকে মুরুব্বি ঠাওরায়। নিয়মের বেড়াজালে জড়িয়ে হাঁপিয়ে ওঠা কেষ্ট বিষ্টুরা মুখে কিছু বলতে না পারলেও সবসময়েই খড়্গহস্ত। পারলে এক ঝটকায় টেনে ছিঁড়ে ফেলে বুলির ঝুঁটি, মটকে দেয় বুলির বেঁটেখাটো গলাটা। আঁটোসাঁটো এই ব্যবস্থা সাবিনারও যে খুব পছন্দ তা নয় কিন্তু সে তেমন ঘাড় মটকানো প্রকৃতিরই নয়। 
             সাবিনার এই সাধুভাব একটু বোধহয় অসুবিধাতেই ফেলে দেয় গুরু গম্ভীর কেষ্টবিষ্টুদের। তার সাবলীলতা, দু'চোখের দৃপ্ত ভাষা, সাদাকে সাদা আর কালোকে কালো বলতে পারার মত বলিষ্ঠ মেরুদন্ড কিছুতেই গ্রহণযোগ্য হয় না গুরুঠাকুরদের। কিছু পাওয়ার জন্য যারা হাতে হাত ধরে, তাদের বশ করতে নিছক কিছু প্রতিশ্রুতিই অব্যর্থ মহৌষধি। কিন্তু সাবিনা! তার যে কিছুই চাওয়ার নেই। তাই প্রতিশ্রুতির বিষ মাখানো তীর একটা পালকও খসাতে পারেনা তার। অনেক সুলুক সন্ধান, বাছবিচার করে দাদাভাইরা সিদ্ধান্ত নিলেন সাবিনাকে জব্দ করার একমাত্র উপায় ওর আত্মসম্মানের দুর্ভেদ্য দেওয়ালটা চুরমার করে দেওয়া। কারো পাকা ধানে মই না দিয়েও সাবিনা কেন যে এই আক্রোশের শিকার হল, তার ব্যাখ্যা কারো কাছে নেই। হয়তো বা বুলির সাথে সাবিনার সম্পর্কের অন্যরকম ধরণটাই তার একমাত্র কারণ। নিজেকে মেলে ধরার জন্য বুলি একটা সুরক্ষিত আশ্রয় পাবে এটা দাদাঠাকুরদের পক্ষে কিছুতেই মেনে নেওয়া সম্ভব নয়।
    সকাল থেকে সেদিন অবিরাম বৃষ্টি পড়ে চলেছে। কারো কোথাও নড়বার উপায় নেই। বুলি আর সাবিনার একটু পাশাপাশি বসার সুযোগ এসে গেল। দুই প্রাণসখা কাছাকাছি বসে থাকলেও সাবিনা কেমন যেন নিজের মধ্যে নেই।
"কি হয়েছে তোমার! মুখ এমন ভার কেন? গলায় আজ মিষ্টি সুরেরও দেখা নেই!"
        সমস্ত আবেগ উজাড় করে সাবিনাকে জিজ্ঞাসা করে বুলি। 
সাবিনা খুব নরম গলায় উত্তর দেয় - "এরকমটা বোধহয় না হলেই ভাল হত"। 
কি হয়েছে, কি না হলেই ভাল হত এসব জানতে চাওয়ার হাজার চেষ্টা করেও বুলি সত্যানুসন্ধান করতে পারল না। সাবিনার স্বভাবই এরকম। কারো কাছে অভিযোগ করতে সে জানেনা। তা সে বুলিই হোক বা আরও অনেক কাছের অন্য কোন জন। 
          কিছুদিন যাবৎ সবুজাঙ্গনে কেমন একটা থমথমে ভাব। সাবিনা আচমকা কেমন যেন বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে সকলের কাছ থেকে। গাছে তুলে মই কেড়ে নিয়ে পাশ থেকে সরে যাওয়া দাদাঠাকুররা কিছুটা বাতিলের দলে ফেলে দিয়েছে সাবিনাকে।  অনেকটা বিনা কারণেই। অপমানে, অভিমানে ক্ষতবিক্ষত সাবিনার বুক ফাটে তবু মুখ ফোটে না।
সেদিন পড়ন্ত বিকেলে বুলির পাশে দুদন্ড বসল সাবিনা। শত চেষ্টা করেও বুলির কাছে নিজের দোলাচল লুকিয়ে রাখতে পারল না সে। আচমকা প্রায় শেষ সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিল বুলিকে-
" সবুজাঙ্গনে আমি আর থাকব না"
বুলির বুকের ভিতরের সমস্ত কলকব্জা  এক লহমায় স্থির হয়ে গেল। 
"মানে!  আমাকে ছেড়ে তুমি চলে যাবে! আমাকে  ফেলে দিয়ে যাবে নি:সঙ্গতার কালকুঠরিতে! না না এমন কোর না ।" 
কাকুতি মিনতি করে বুলি জানতে চায় সাবিনার এই কঠিন সিদ্ধান্তের কারণ।
চোখের কোণে জলের ফোঁটা অতি কষ্টে সামলে রেখে সাবিনা বলে - "তোমাকেও বলতে হবে! তুমিও বুঝবে না!"
এই কঠিন সত্যের মুখে দাঁড়িয়ে মাথা নীচু হয়ে গেল বুলির। সত্যিই তো নিজের ভালোবাসার জনের মনের কথা যদি বুঝতেই না পারা গেল তাহলে সে ভালোবাসার সার্থকতা কোথায়!
       কয়েকদিনের মধ্যে সবুজাঙ্গনে ঘটে যাওয়া সমস্ত ঘটনা গুলো একের পর এক সাজাতে সাজাতে বুলি খুঁজে পায় তার প্রশ্নের উত্তর। বুঝতে পারে এই কদিনে কি প্রচন্ড ঝড় বয়ে গেছে সাবিনার মনের উপর দিয়ে। সবুজাঙ্গনের তথাকথিত মাতব্বররা কি নির্মম ভাবে ক্ষতবিক্ষত করেছে সাবিনার ফুলের মত নরম সংবেদনশীল মনটাকে। আর সাবিনা একা বয়ে বেড়িয়েছে এই দু:সহ ক্ষতের যন্ত্রণা। জানতেও পারেনি বুলি। 
        নিজের উপর খুব রাগ হয় বুলির। কেমন বন্ধু সে! বন্ধুর বুকে লুকিয়ে থাকা গভীর আঘাতে এতটুকু প্রলেপ লাগাতে পারে না! প্রতিজ্ঞা করে, সাবিনার এই অপমানের যোগ্য জবাব সে দেবে। যেমন করেই হোক নিজের ভালোবাসার জনকে দুর্বিষহ, দম বন্ধ করা অসম্মানের খাঁচা থেকে মুক্ত করবে সে। বন্ধুর প্রশ্বাসবায়ুতে মিশিয়ে দেবে ভালোবাসার আবেশে ফোটা হাস্নহানার গন্ধ। মাখনের ছুরির মত মধুর কথায় অন্যকে বিঁধে ফেলার অদ্ভুত ক্ষমতা আছে বুলির। এই অসম যুদ্ধে সেই ক্ষমতাকেই প্রধান অস্ত্র হিসেবে বেছে নিল সে। 
             সুরের ইন্দ্রমহলে সাবিনা অন্যতম ঊজ্জ্বল নক্ষত্র। নিজের সেই জ্যোতি গোটা নন্দনভূমিতে ছড়িয়ে দেওয়ার স্বপ্ন দেখেছিল সাবিনা। আকাশপ্রদীপের সেই জ্যোতি নিভিয়ে দেওয়ার জন্য ফাঁদ পেতেছিল সবুজাঙ্গনের মেনকা আর তার সঙ্গীরা যারা নিজেদের সবুজাঙ্গনের হর্তাকর্তা বিধাতা বলে ভাবতে অভ্যস্ত। সাবিনার ছোট্ট স্বপ্নকে সত্যি করে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে প্রস্তুতিহীন এক যুদ্ধের সামনের সারিতে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল তাকে। সীমান্তে দাঁড়িয়ে থাকা নিরস্ত্র সৈনিকের মত। বুলির ধর্মযুদ্ধে মেনকাই হল প্রথম বন্দি সেনা। বুলির ঝুঁটির ঝাপটা, নখের আঁচড় আর মধুর বক্রবচনের একের পর এক তীক্ষ্ণ আঘাতে প্রাণের দায়ে রণে ভঙ্গ দেয় মেনকা। সঙ্গে নিয়ে যায় তার পরম বশংবদ কমললতাকে। বুলির কথা তাদের পছন্দ না হলেও বুলির যুক্তির ধারালো তলোয়ার ফালা ফালা করে দিয়েছে বর্মের আড়ালে থাকা মেনকা আর কমললতার অহংকারী বিবেককে। শুধু এটুকুই নয় আরো অনেক অব্যর্থ অস্ত্র আছে বুলির আস্তিনে। সে সব অস্ত্রে একে একে শান দিতে থাকে বুলি।  গুরুঠাকুরদের এক এক করে ঘায়েল করতে হবে তাকে। অত্যন্ত পরাক্রমশালী কেশরীমোহন, নৃপতিকুমার, সূর্য্যনন্দন, তথাগত আরও আরও কত ছোটবড় জানা অজানা নারায়ণী সেনা নিয়ে তৈরী বাহুবলী গুরুঠাকুরের দল। বুলির সম্বল শুধু তার ধারাল যুক্তি আর উপস্থিত বুদ্ধি। কিন্তু বুলি সকলের চেয়ে অনেক শক্তিধর। সাবিনার ভালোবাসার অনন্ত মহাকাশ তার বিচরণক্ষেত্র। চুড়ান্ত অসম এক লড়াই চালিয়ে যায় বুলি। মর্যাদা রক্ষার লড়াই। নিজের ভালোবাসাকে জয়ী করার লড়াই। বুলির ছোট্ট হৃদয়ের অতলান্তিক ভালোবাসাকে প্রতিষ্ঠা করার লড়াই। হার না মানার লড়াই।
               সাজগোজ করতে করতে মুখোমুখি লড়াইটা লড়েই ফেলল বুলি। এক হ্যাঁচকা টানে ছিঁড়ে ফেলল সবুজাঙ্গনের সমস্ত গুরুঠাকুর আর তাদের দলদাসদের মুখোশ। কয়েকদিনের নিরন্তর লড়াই বুলিকে দাঁড় করিয়ে দিল এক নির্মম সত্যের মুখোমুখি - সবুজাঙ্গনে বুলি একদম একা। তার চারপাশে একটাই দল যার নাম "বিরোধী"। কেউ বিরোধিতার উদ্দেশ্যে বিরোধী  কেউ আবার ক্ষমতা হারানোর ভয়ে। হাজার কঠিন হলেও এ লড়াই বুলিকে জিততেই হবে। তাতে যদি ছোট্ট শরীরটা ক্ষতবিক্ষত হয়ে যায় কিংবা নিভেই যায় জীবনের আলো, তাতেও ক্ষতি নেই। তবু সাবিনাকে সে বোঝাবেই তার ভালোবাসার গভীরতা। 
                  ডালপালার আড়াল থেকে শুরু হওয়া ঠান্ডা লড়াই ধীরে ধীরে তর্কযুদ্ধের গলিপথ পার হয়ে পৌঁছল তীব্র মানসিক যুদ্ধের প্রশস্ত রাজপথে। বুলির উপর চলতে লাগল অসহনীয় মানসিক অত্যাচার। সবুজাঙ্গনের সমস্ত বাতাসে বারুদের গন্ধ। একের পর এক বিস্ফোরণ ধ্বংস করে দিল নন্দনভূমির নিস্তব্ধতা। শত্রুপক্ষের প্রবল বাহুবল আর মানসিক নির্যাতনের সাঁড়াশি আক্রমণে বুলি বন্দি হল চক্রব্যুহে। শুধুমাত্র অকাট্য যুক্তি আর অদম্য মনোবলকে সম্বল করে বধ্যভূমিতে পা রেখেছে সে। সামনে রয়েছে তার হৃদয় উজাড় করা ভালোবাসার ঢাল। সমস্ত অস্ত্রের আঘাত সেই ঢাল দিয়ে ঠেকাতে ঠেকাতে চক্রব্যুহ ভেদ করল বুলি।            
           সবুজাঙ্গনে এল নতুন ভোর। ভোরের শুরুতেই আকাশ বাতাস জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে সাবিনার সুরের সৌরভ। বুলির দুই কানে বাজছে আনন্দভৈরবী। সবুজাঙ্গনের মুক্ত প্রাঙ্গনে সাবিনার এখন অবাধ গতি। প্রত্যেকের চোখে সাবিনার প্রতি সম্ভ্রমের দৃষ্টি। বিজয় নিশ্চিত জেনেও শুধুমাত্র সবুজাঙ্গনকে কলুষমুক্ত রাখতে কারো সাথে কোন সংঘাতে যায়নি সাবিনা। তার এই কঠিন সিদ্ধান্ত তার প্রতি অনেকের শ্রদ্ধা বাড়িয়ে দিয়েছে কয়েক গুণ। অবলীলায় ক্ষমতার হাতছানি এড়িয়ে সাবিনা প্রতিষ্ঠা করেছে তার মূল্যবোধের শক্ত বুনিয়াদ। সকলের কাছ থেকে পাওয়া সাবিনার এই সম্মান অনেক উঁচুতে তুলে ধরেছে বুলির ধর্মযুদ্ধের বিজয় পতাকা। দুজনের ভালোবাসা সবুজাঙ্গনের প্রতিটি কোণায় ছড়িয়ে দিয়েছে যুদ্ধবিরতির উদাত্ত ঘোষণা।
            বেশ কয়েকদিন পর আজ আকাশে কনে দেখা আলো। পশ্চিমের আকাশটায় আগুনপাখি মেলে ধরেছে তার চওড়া ডানা দুটো। বাসায় ফেরার আগে আজ সাবিনার মন বড় চঞ্চল। রণক্লান্ত বুলিকে এক ঝলক দেখার জন্য আকুল।  শ্লথ গতিতে সাবিনার খুব কাছে এসে বসল বুলি। সাবিনার ইচ্ছে করে  নিবিড় আলিঙ্গনের আবেশে বুলিকে জিজ্ঞেস করে- "তুমি কি খুব ক্লান্ত"! 
পরম যত্নে বুলির দিকে তাকায় সাবিনা। 
"একি! তোমার অমন রংবাহারি ঝুঁটি! কোথায় গেল সে!" 
ক্ষীণ স্বরে বুলি উত্তর করে- "এক কোপে কেটে দিয়েছে কেশরীমোহন।"
"তোমার ডানায় এত গভীর ক্ষত! কেমন করে হল এসব?"
"এসব সবুজাঙ্গনের পুরস্কার। আগ্রাসী, ক্ষমতালোভীদের মুখোশ ছিঁড়ে ফেলতে পারার সাফল্যের স্বীকৃতি। তোমার মনের কথা বুঝতে না পারার প্রায়শ্চিত্ত"।
বুলির দু'চোখের কোণ দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে সরু জলের ধারা। ঠোঁটের দুই কোণে শুকিয়ে যাওয়া রক্তের দাগ। ক্ষতবিক্ষত  পায়ে ভর রাখতে কষ্ট হচ্ছে তার। থরথর করে কাঁপছে সারা শরীর। অনেক চেষ্টা করে যন্ত্রণায় ছিঁড়ে যাওয়া ঘাড়টা সাবিনার দিকে ঘোরায় বুলি- 
"দেখো সমস্ত নন্দনভূমি আজ তোমার গুণমুগ্ধ। তোমাকে বিন্দুমাত্র অসম্মান করার সাহস আজ আর কারও নেই। আর কোন অভিমান নেই তো তোমার!"
সাবিনার কন্ঠের সমস্ত সুর এক নিমেষে কে যেন চুরি করে নিয়ে গেল। 
"এ তুমি কি করলে! নিজেকে এমন করে তালগোল পাকিয়ে দিলে কেন! তোমার আঘাতের বিনিময়ে পাওয়া এই সম্মানের কোন মূল্য নেই আমার কাছে। আমি তো শুধু তোমাকে নিয়েই সুখী থাকতে চাই।  আর কিচ্ছু চাই না আমার। জোর করে ছিনিয়ে আনা এই সম্মান ক্ষণস্থায়ী।  সবুজাঙ্গনের এই খোলা হাওয়ায় আমায় ভেসে বেড়াতে দাও। কিচ্ছুতে জড়িও না আমায়। আমি ছুটি চাই বন্ধু, ছুটি দাও আমায়"।
           ক্লান্তিতে প্রায় বুঁজে আসা চোখ দুটো জোর করে খুলে সাবিনার দিকে তাকায় বুলি। "বন্ধুই যদি হলাম তবে ছুটি নিতে চাও কেন? এখনো যে আমার লড়াই অনেক বাকি। প্রাণের স্পন্দন যেটুকু অবশিষ্ট আছে তা দিয়ে তোমায় সাথে করে লড়তে চাই। বন্ধু ফেলে যেও না আমায়।"
           এবার আর সাবিনা নিজেকে সামলাতে পারে না। এক ঝটকায় কাছে টেনে নেয় বুলিকে। ভরিয়ে দেয় চুম্বনে চুম্বনে। আদরে, আশ্লেষে নিবিড় থেকে আরও নিবিড় আলিঙ্গনে আবদ্ধ হয় ওরা। 
"তোমায় ছেড়ে আর কোথাও তো যাবার উপায় আমার নেই। কিন্তু বন্ধু আমার যে বড় ভয় করে! সবুজাঙ্গনের এই বারুদের স্তুপ যদি ঘটায় তীব্র সর্বনাশা বিস্ফোরণ! আচমকা ছুটে আসা জলোচ্ছাসে যদি তলিয়ে যায় গোটা নন্দনভূমি! আমরা কোথায় দাঁড়াব বন্ধু"!
                  সাবিনার আদরের কোমল স্পর্শে কর্পূরের মত উবে গিয়েছে বুলির সমস্ত যন্ত্রণা। নিজের ভালোবাসার আয়নায় নিজেকে মনে হচ্ছে এক বিজয়ী সেনাপতি। সাবিনার উষ্ণ আলিঙ্গনে শান্ত হয়ে গিয়েছে বুলির কাঁপতে থাকা ক্ষতবিক্ষত  শরীরটা। গলার আওয়াজ কিছুটা হলেও ফিরে পেয়েছে আপন মাধুরী। সাবিনার চোখের উপর চোখ রেখেছে বুলি। গালের উপর গাল। অন্তরঙ্গ আদরে মধুমাখা স্বরে বুলি উজাড় করে দিল নিজের হৃদয়ের সমস্ত আবেগ- "বন্ধু, হোক না সর্বনাশ, আসুক জলোচ্ছাস। একসাথে ভাসতে যদি না হয় পারলামই না,  চলো না একসাথেই ডুবি!"

Friday, 17 December 2021

গান্ধারী

চল চল আর দেরি করিস না বাবা। মুখের সামনে যেটুকু খাবার আছে নিয়ে শিগগির বেরিয়ে পড়। দেখছিস না লোকগুলো সব যন্ত্রপাতি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে!! 
ছোট্ট ছেলেটা মার মুখের দিকে করুণ চোখে তাকায়।
কোথায় যাব মা! আমাদের এই ঘরটা যে এত যত্ন করে তুমি সাজালে? এটা ছেড়ে চলে যাব আমরা?
ঘর? পাগল ছেলে। জংলীদের আবার ঘর হয় নাকি! কোন ঠিকানা হয় নাকি? ওই যে লোকগুলোকে দেখছিস! ওরা হল পরিষ্কারওয়ালা। আমাদের মত জংলীদের সাজানো ঘরদোর, গোছানো পরিবার, চোখের স্বপ্ন সবকিছু বিলকুল পরিষ্কার করে দেয় ওরা। 
এত কথা বলার সময় নেই এখন।  তাড়াতাড়ি কর নইলে বুকের রক্তটুকুও ওরা পরিষ্কার করে দেবে। 
কোনওরকমে সব কিছু গুটিয়ে নিয়ে পিচের রাস্তায় উঠে পড়ল গান্ধারী। পিছনে তার পাঁচ পাঁচটি ছেলেপুলে। সবচেয়ে ছোটটা ভালো করে হাঁটতেও শেখেনি। তাকে যে আগলে নিয়ে যাবে সে উপায়ও গান্ধারীর নেই। পিচ রাস্তায় গাড়ি ঘোড়া সামলে আর একটা আস্তানায় পৌঁছোতে হবে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। 
গান্ধারী আর তার পরিবার রাস্তার মোড়টা ঘুরে গেল চোখের পলকে। খোলা বারান্দায় কফির কাপ হাতে নিয়ে দেখছিল রায়া। গান্ধারীর অস্থায়ী আস্তানাটা কেমন যেন ফেলে যাওয়া কাপড়ের মত আলুথালু হয়ে রয়েছে। সেইদিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে বকুল। রায়া একটু খেয়াল করে দেখার চেষ্টা করল বকুলের চোখে কি জল? গান্ধারীর পরিবারের সাথে বকুলের কতদিনের সখ্যতা। যেদিন ওরা দুটোতে মিলে মাটি খুঁড়ে খুঁড়ে তৈরী করেছিল এই আস্তানাটা, তখন বকুলের বাচ্চা গুলো খুব ছোট। জলা জায়গায় ছেলেপুলে নিয়ে থাকতে খুব ভয় করত বকুলের। সাপখোপের হাত থেকে বাচ্চাগুলোকে বাঁচিয়ে রাখা, তাদের খাবারের জোগাড় করা সবটাই খুব কঠিন ছিল বকুলের পক্ষে। বাচ্চাগুলো জন্মানোর পরই বকুলের মরদটা কোথায় যে হারিয়ে গেল! গান্ধারী তখন পাশে দাঁড়িয়েছিল বকুলের মুশকিল আসান হয়ে। গলা পর্যন্ত জলে ডুবে সাপখোপের ছোবল থেকে আগলে রাখত বকুলের বাচ্চাগুলোকে। সারাদিনের রসদ জোগাড় করে বাচ্চাগুলোর মুখে তুলে দেওয়ার জন্য হাঁপাতে হাঁপাতে যখন ছুটে আসত বকুল, দেখত সবচেয়ে ছোট বাচ্চা টা ভয়ে কুঁকড়ে শুয়ে আছে গান্ধারীর দু'হাতের ফাঁকে। ধীরে ধীরে গান্ধারীর ঘর আলো করে এলো ছেলেপুলে গুলো। বাচ্চা গুলোকে নিয়ে সেদিন রোদে খেলছিল ওদের বাবা। হঠাৎ  এক বড়লোকের ছেলে গাড়ি চালানো শিখতে শিখতে আস্ত গাড়িটাই তুলে দিল ওদের বাবার ঘাড়ে। দু হাত আকাশের দিকে তুলে, রক্তে ভেসে যাওয়া শরীরটা ছটফট করতে করতে নিথর হয়ে গেল। হৈ হৈ করে ছুটে এল গান্ধারী, বকুল, বাসন্তী, ছেদিলাল সবাই। কিন্তু জংলীদের জীবনের মূল্য বোঝাতে পারল না গাড়ি চালানো শিখতে আসা নবাবের বেটা কে। গান্ধারীর আস্তানার দিকে তাকিয়ে সে কথা মনে পড়ে গেল বকুলের। আহা সেদিন গান্ধারীর দু:খ ভোলানোর জন্য কতরকম গান শুনিয়েছিল বাসন্তী। ঘুমপাড়ানি গান, মন ভালো করার গান, কান্না থামানোর গান আরও কত কি! আজ বাসন্তীর বসার জায়গাটাও পরিষ্কার করে দিল পরিষ্কারওয়ালারা। বাসন্তী জানতেও পারল না। কয়েকদিন পরে ছেদিলালের ওই বিশ্রী ঘরটাতে নিজের বাচ্চা গুলোকে চালান করার জন্য যখন বাসন্তী আসবে, খুব কষ্ট পাবে বেচারা। রায়া হয়তো তখনো বারান্দায় এসে দাঁড়াবে বাসন্তীর গান শোনার জন্য, কিন্তু মিষ্টি রোদের আড়ালে বসে গান গাওয়ার সুখটাই আর পাবে না বাসন্তী। রায়ারও আর গান শোনা হবে না। ছেদিলাল মনে মনে ভাবে যাক বাবা আমার গায়ে পরিষ্কারওয়ালারা কোন আঁচড় কাটতে পারেনি। ছেদিলালের এই অসাড় সন্তুষ্টি দেখে রায়ার ভারি অদ্ভুত লাগে। জংলীরা এত পরশ্রীকাতর হয় নাকি! ওতো সভ্যলোকের স্বভাব।
এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেল আচমকা। গান্ধারীর আস্তানার চারপাশটা বৃষ্টির ঝাপটায় কেমন এলোমেলো হয়ে গেল। যেন এক ঝটকায় মুছে দিয়ে গেল গান্ধারীর  গোটা পরিবারটার অস্তিত্ব। ঝুপ করে অন্ধকার নামতেই একে একে ঘর ছেড়ে বেরোতে লাগল জুগনুর বন্ধুবান্ধবরা। প্রত্যেকের হাতে টিম টিম করে জ্বলছে লন্ঠন। একজন দুজন করে দলটা যখন  বেশ ভারী হয়েছে,  আকাশমুখো জুগনু চিৎকার করে বলে উঠল - ওরে তোরা আর উঠিস না, বিশ্রাম নেওয়ার আর কোন জায়গা নেই। চলতে চলতে ক্লান্ত হয়ে বসে লন্ঠন গুলো উসকে দিত ওরা। মিশকালো রাত্রিটা ওদের লন্ঠনের আলোয় কেমন স্বপ্নময় হয়ে উঠত। আর সেই আলোর রোশনাই দেখে সুরবাহার বেঁধে নিত পান্নাবাঈ আর তার মজলিশী  সঙ্গীসাথীরা। নিখুঁত সুরের মূর্চ্ছণায় কানায় কানায় ভরে উঠত জংলী দুনিয়াটা। গোধুলির আলোর ছোঁয়ায় অপরূপা  হয়ে ওঠা নববধু, প্রাণের পরশ পেত পান্নাবাঈ এর ইমনের আলাপে। মরমীয়ার উষ্ণ আলিঙ্গন বাঙ্ময় হয়ে উঠত দরবারীর তানে বিস্তারে। জুগনুদের লন্ঠনের আলো যখন ভোরের আকাশকে কুর্নিশ জানিয়ে নিভে যেত, সুখনিদ্রা শেষে যখন চোখ মেলত মরাল-মরালী, পূবালী বাতাসে তখন ছড়িয়ে যেত পান্নাবাঈ এর ভৈরবীর বন্দিশ। সমস্ত দৃশ্যটা যেন চোখের সামনে ভেসে উঠল রায়ার। পরিষ্কারওয়ালাদের বেলচা কোদালের ঝনঝনানি, কবর দিয়ে দিয়েছে সেই দৃশ্যপটের। ফতোয়া জারি করেছে বকুল, জুগনু, পান্নাবাঈদের। সমস্ত কিছু উপড়ে ফেলে পরিষ্কার করা এই নন্দনকাননে জংলীদের প্রবেশ নিষেধ। 
      কত না ঘুমোন রাত্রি রায়া কাটিয়েছে এই জুগনুর দলের লন্ঠন নৃত্য দেখে আর পান্নাবাঈ এর রাগরাগিণীর মজলিশ শুনে। রোজ সকালে গান্ধারী যখন তার ছেলেমেয়েদের সাথে নিয়ে হেঁটে যেত পিচ রাস্তার উপর দিয়ে, কি যে সুন্দর দেখতে লাগত! রায়া প্রাণ ভরে অনুভব করত গান্ধারীর মাতৃত্বের সৌরভ। বকুলের বাচ্চাগুলো রায়ার চোখের সামনে একটু একটু করে বেড়ে উঠল। সন্তান লালনের প্রতিটা ধাপের কঠিন চ্যালেঞ্জ একটু একটু করে কাটিয়ে উঠল বকুল, একেবারে একা। রায়াকে পড়িয়ে দিয়ে গেল জংলী লড়াইয়ের কঠিন পাঠ।
       জংলী এই পরিবেশটাকে সাফসুতরো করার জন্য দরবার করেছে সবাই। উঠেপড়ে লেগেছে সমস্ত আগাছা উপড়ে ফেলার জন্য।  উন্নয়নের কাণ্ডারি  হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে পরিষ্কারওয়ালারা। কেউ ভেবে দেখেনি গান্ধারী, বকুল, বাসন্তী, জুগনু, পান্নাবাঈদের কথা। রায়া অনেকবার বলার চেষ্টা করেছে - থাকনা সবাই যে যেমন আছে! কিন্তু উন্নয়নের বিউগলের আওয়াজের আড়ালে রায়ার মৃদু প্রতিবাদ মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি।     
      পরিষ্কারওয়ালারা সদর্পে পরিষ্কার করে দিয়ে গেছে রায়ার বারান্দার সামনের আগাছায় ভর্তি জলা জঙ্গলটা। রায়া হারিয়ে ফেলেছে তার সেই জংলী বন্ধুদের, যাদের সাথে সে সারারাত সুখ দু:খের গল্প করত। রায়ার খারাপ মন ভাল করার জন্য কত কেরামতিই দেখাত তার জংলী বন্ধুরা। 
আজ আর কে জেগে থাকবে বিনিদ্র রায়ার সাথে রাতের পর রাত! রায়ার চোখের অন্ধকার কাটাতে আর তো আসবেনা জুগনুর দল। ক্লান্তিতে ভেঙে পড়া শরীরটা আর তো চনমনে হয়ে উঠবে না পান্নাবাঈ এর গানের আমেজে! ভাবতে ভাবতে দুচোখ ভিজে যায় রায়ার। বাসন্তীর দু:খহরণ সঙ্গীতের জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠে রায়ার মনটা। কেমন আছে গান্ধারী!  ওর ছোট বাচ্ছাগুলো! আদৌ কি আর কোন আস্তানার খোঁজ পেল তারা!
          শীতের সকালের আমেজ চেটেপুটে নিতে নীচে নেমেছে রায়া। কেমন যেন খাঁ খাঁ করছে সামনের জায়গাটা। উপড়ে যাওয়া গাছ, ছেঁটে ফেলা ডালের স্তুপ, জড়ো করে রাখা শুকনো ঘাস, হেলে পড়া কচু গাছগুলো, সবটা মিলে যেন যুদ্ধের ধারাবিবরণী।  রায়ার বিনিদ্র রাতগুলোর সাক্ষীরা এই অসম যুদ্ধের পরাজিত সৈনিক। রায়া হঠাৎ  দেখল জড়ো করা ঘাসের স্তুপের মধ্যে কি যেন নড়াচড়া করছে। কিছুক্ষণ পর মাথায় এক দলা শুকনো ঘাস মুকুটের মত পরে বেরিয়ে এলেন রাজমহিষী গান্ধারী। হয়তো বা ফেলে যাওয়া সংসারে কিছু কেজো জিনিসের সন্ধানে এসেছেন তিনি। রায়াকে দেখে দুহাত তুলে শরীরটাকে সোজা করে দাঁড়াল গান্ধারী। কালো ভ্রমরের মত চোখ গুলো দিয়ে কত কিছুই না বলতে চাইল সে। তার চোখের সব করুণ ভাষা পড়তে পারে না রায়া। দুপায়ে ভর দিয়ে সোজা দাঁড়িয়ে থাকা গান্ধারী কে দেখে রায়ার একটাই কথা মনে হয় এ গান্ধারী আপোষ  করেনা বুক চিতিয়ে লড়তে জানে। 

Friday, 23 July 2021

অদলবদল

              আজ সকাল থেকে আকাশটা কেমন মনমরা। একপশলা ভোরের বৃষ্টিতে ভিজে  গাছগুলোর ঘুম বোধহয় একটু তাড়াতাড়িই ভেঙ্গে গেছে। রাস্তার ধারের লাল রঙ্গন ফুলের গাছটা ফুলের ভারেই বুঝি মূর্ছা যাচ্ছে। সকালে হাঁটতে আসা মানুষের দলগুলো আজ অনেকটাই হালকা। ম্যাজম্যাজে দিনটা আজ বোধহয় একটু দেরী করেই শুরু হবে। সমস্ত স্বাস্থ্যবিধি উড়িয়ে যে চায়ের দোকানগুলো রোজ এ সময় ভিড়ে উপচে পড়ে আজ সেখানেও যেন একটু অন্য ছবি। রাস্তার ঠিক মাঝখানে বিশাল এক যন্ত্র তিনদিন ধরে অবিরাম গর্ত খুঁড়ে চলেছে। নাগরিক পরিষেবা। দুপাশের বাড়ির লোকগুলোর প্রাণান্তকর অবস্থা।


                      আজকাল দুয়ারে বাজারের এত প্রচলন যে মানুষের বাজার যাওয়ার তাড়াও আর বিশেষ নেই। প্রতিটা বাড়ির বারান্দায়, উঠোনে, বাড়ির সামনের রাস্তায়, গলির মোড়ে মা - কাকিমা রা অপেক্ষা করেন তাঁদের পছন্দের সবজিওয়ালা, মাছওয়ালা আসবে। রোজ দেখা হতে হতে কেমন একটা হালকা হাসির পরিচয় হয়ে গেছে ওদের সাথে। কয়েকদিন না দেখতে পেলে জিজ্ঞাসা করেন - কি ব্যাপার সব ঠিক আছে তো!  ঘাড় নেড়ে কিংবা হাত নেড়ে দিয়ে যাই কুশল সংবাদ। আজ হাঁটতে হাঁটতে একটু অন্যদিকে চলে এসেছি। এখানেও মা কাকিমাদের একই রকম ছবি, কিন্তু এদের সাথে আমার হালকা হাসির পরিচয়টুকুও নেই। হঠাৎ চোখে পড়ল একটা বাড়ির সামনের রাস্তায় একজন শীর্ণকায় বয়স্ক মহিলা দাঁড়িয়ে আছেন। দুয়ারে বাজারের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছেন বলে মনে হল না। সামনে দিয়ে যে ই যাচ্ছে কি যেন একটা জিজ্ঞাসা করছেন, কিন্তু কেউই ওনার কথার জবাব দিচ্ছে না। চলে যাচ্ছে নিজের মত। পায়ে পায়ে এগিয়ে আমিও ওনার ঠিক সামনে এসে পড়েছি প্রায়। আমার আগে যে মহিলা চলে গেলেন তিনিও ওনার প্রশ্নের উত্তর দিলেন না কিন্তু আমি প্রশ্নটা শুনতে পেলাম - "আজ শুক্রবার?" মনে হল আজ তো শুক্রবারই। এই রকম একজন বয়স্ক মানুষের প্রশ্নের উত্তরে একটা হ্যাঁ বলার জন্য কারো হাতে ফুরসত নেই! আমি ওনার সামনে আসতেই একই প্রশ্ন আমাকে করলেন উনি আমি দাঁড়িয়ে বললাম - হ্যাঁ মাসীমা আজ শুক্রবার। উনি ফোকলা দাঁতে একগাল হেসে বললেন - "ছেলে আসবে তো তাই"। আমারও মনটা কেমন অজানা খুশিতে ভরে গেল। আর একবার ঘুরে তাকালাম ছেলের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকা 'মা' কে দেখার জন্য। 

                 হনহন করে হেঁটে পেরিয়ে যাচ্ছিলাম আমার আগের মহিলাকে। উনি আমায় জিজ্ঞাসা করলেন - দিদি ঠাকুমা কি জিজ্ঞাসা করছিল? আমি সবটাই বললাম। বলল - রোজ সবাইকে জিজ্ঞাসা করে জানেন তো! আমরা আজকাল আর উত্তর দিই না। আপনি উত্তর দিলেন তো আপনাকে রোজ জিজ্ঞাসা করবে। মনে মনে ভাবলাম কি বাহাদুরী করেন উত্তর না দিয়ে। ভদ্রমহিলা বলে চলেছেন। আমার হাঁটার গতিও থেমে গেছে। আসলে ঠাকুমার একটাই ছেলে জানেন তো। সবজির লরি চালায়। শুক্রবার করে এসে মা'কে সারা সপ্তাহের খরচ দিয়ে যায়। দিনকুড়ি আগে এক্সিডেন্টে ছেলাটা মরে গেছে। ঠাকুমা জানে না। 

                  আমার পা দুটো আর চলছেই না। অনেকটা এগিয়ে এসেছি, ছেলের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকা মা'কে আর দেখতে পাচ্ছিনা। গলাটা যেন বুঁজে আসছে। হা ঈশ্বর এ কেমন বিচার! সেদিন এক বন্ধুর লেখা গল্প 'এক্সচেঞ্জ অফার'  পড়ছিলাম। সমস্ত পুরোন অচল জিনিস বদলে ঝাঁ চকচকে জিনিসে ঘর ভরিয়ে দিতে পারেন কোম্পানীর সাহেব মালিক। বাড়ির অশীতিপর বাতিল হয়ে যাওয়া দাদুকেও তিনি বদলে দিতে চান। এমন কোন গঞ্জালভেস কি পারেনা  অনন্ত অপেক্ষার বদলে এই মাকে ঝাঁ চকচকে সুন্দর একটা ভবিষ্যৎ দিয়ে যেতে? যাতে উনি আর যে কটা দিন বাঁচবেন ওই ফোকলা দাঁতের হাসিটা নিয়ে বাঁচতে পারেন? কিন্তু না। পৃথিবীতে শুধুমাত্র মা আর সন্তানের সম্পর্কটাই যে শাশ্বত। তার যে কোন অদলবদল হয় না।  




Saturday, 26 June 2021

টিউনিং

                        একই ছন্দে চলতে থাকা জীবনটায় মাঝে মাঝে কিছু কিছু বিষয় কেমন যেন ঝাঁকুনি দিয়ে যায়। প্রতিদিনই কাগজ পড়ি। রবিবারের কাগজে বিশেষ কোন লেখা থাকলে তা বেশ মন দিয়েও পড়ি। কিন্তু এই লেখাটা কেমন যেন নাড়িয়ে দিয়ে গেল। লেখাটার প্রতিটা লাইন যেন আমাকে প্রশ্ন করে গেল - নিজেকে খুঁজে পেলে? চারিদিক থেকে ভেসে আসা অনেক রকম সুর কানের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় জিজ্ঞাসা করে গেল - চিনতে পারো আমায়? বর্তমান যুগের গান আর তাতে ব্যবহার করা বাদ্যযন্ত্রের উপর কিছু বিষয় নিয়ে এই প্রবন্ধ। তাতে প্রধানতঃ হারমোনিয়ামের ব্যবহার আর তার ঐতিহাসিক পটভূমির উপর বিস্তারিত আলোচনা। আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একজন প্রখ্যাত শিল্পীর ব্যবহার করা একটি হারমোনিয়াম আর সেই হারমোনিয়ামের সাথে জড়িয়ে থাকা সেই শিল্পীর আবেগ। শিল্পী পুরাতনী বাংলা গানের যাদুকর রামকুমার চট্টোপাধ্যায়। তিনি রোমন্থন করেছেন তাঁর প্রিয় হারমোনিয়ামের স্মৃতি। এই হারমোনিয়াম বাংলা গানের এক সম্পদ। কলকাতার নামজাদা  হারমোনিয়াম প্রস্তুতকারক শরৎ চন্দ্র সর্দার মহাশয়ের নিজের হাতে তৈরী এই হারমোনিয়াম। রামকুমার বাবু এই হারমোনিয়ামের বিষয়ে এতটাই আবেগপ্রবণ যে তিনি এই হারমোনিয়াম কোনদিন টিউনিং করাননি পাছে শরৎ চন্দ্র সর্দার মহাশয়ের বেঁধে দেওয়া সুর কোনভাবে বিকৃত হয়। হারমোনিয়ামটার ছবি দেখে আমার মনের ঘড়ির কাঁটা উলটো দিকে ঘুরতে শুরু করল। ।

                       এই হারমোনিয়ামের সঙ্গে আমার পরিচয় ১৯৮৮ সালে। সুগমসঙ্গীতে  কিছুটা তালিম নেওয়ার পর একটু অন্য ধরণের গান বাজনার তালিম নেওয়ার স্বপ্ন জেগেছিল মনে। কিন্তু তেমন কোন গুরুর সান্নিধ্য পাওয়া বড় সহজ ছিল না। আমার বড়দাদু (বাবার বড় মামা) তারু মূখার্জ্জী মহাশয় তৎকালীন বাংলা সিনেমা জগতের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সিনেমা পাড়ায় যাতায়াতের সুবাদে বেশ কিছু নামজাদা মানুষের সাথে পরিচয় ছিল তাঁর। একদিন কথা প্রসঙ্গে আমাকে বললেন পুরাতনী গান শিখবি? আমার তখন এ ধরণের গান সম্পর্কে বিশেষ ধারণা নেই। তবে রামকুমার চট্টোপাধ্যায়ের নামের সাথে অল্পবিস্তর পরিচয় ছিল। বড়দাদু বললেন ঠিক আছে আমি নিয়ে যাব তোকে। পুরাতনী গান সম্পর্কে আমার জ্ঞান  তখন এতটাই সীমিত, যে যাবার কথা শুনে বিশেষ আনন্দিত হই নি। বরং একেবারে নিশ্চিত ছিলাম দাদু যদি আমাকে নিয়ে গিয়ে রামকুমারবাবুর কাছে হাজির ও করেন, উনি আমাকে গান শেখাতে রাজী হবেন না। অবশেষে কোন এক রবিবারে বাবা, আমি আর বড়দাদু বাঁধাঘাট থেকে ফেরীতে চড়ে বসলাম আহিরীটোলা যাবার উদ্দেশ্যে। ফেরী চড়ে সেই প্রথমবার গঙ্গা পার হওয়া। আহিরীটোলা ঘাটে নেমে তিনজনে গল্প করতে করতে হেঁটে চলেছি। উত্তর কলকাতার গলি রাস্তা, বাবা চিনিয়ে নিয়ে চলেছে কোথায় কোথায় কলকাতার বড় বড় দূর্গাপূজা হয়। বেশ অনেকটা রাস্তা চড়া রোদে হেঁটে পৌঁছলাম একেবারে সংকীর্ণ একটা গলিতে। ৫ নম্বর তারক চ্যাটার্জ্জী লেন। বাড়ির সদর দরজাটা এত নীচু, একজন সাধারণ উচ্চতার মানুষ সোজা হয়ে ঢুকতে পারেন না। দরজা দিয়ে ঢুকেই ছোট্ট একটা উঠোন। সেই উঠোনের চারিদিক ঘিরে বেশ কয়েকটা ঘর। একেবারে সোজা যে ঘরটা দেখা যাচ্ছে, সেটা বোধহয় বাড়ির সবচেয়ে ছোট্ট একটা কুঠুরী। এই কুঠুরীই আসলে সঙ্গীতের এই যাদুকরের সাধনক্ষেত্র। বড়দাদু ভিতরে ঢুকলেন। আমি আর বাবা বাইরে অপেক্ষা করছি।  আটপৌরে পোশাকে চেয়ারে বসে আছেন রামকুমার চট্টোপাধ্যায়। একেবারে বৈঠকী মেজাজে। বড়দাদু কি বললেন জানিনা, কিন্তু আমার কানে একটাই কথা ভেসে এল। একটু সরু সুরেলা কন্ঠে রামকুমার বাবু বলছেন - আপনি কি পাগল হয়েছেন! এই টুকু মেয়েকে আমি কি শেখাব? আমি একটুও কষ্ট পেলাম না। আমি এর জন্য মানসিক ভাবে প্রস্তুত ছিলাম। আমার সঙ্গীত শিক্ষা সত্যিই পুরাতনী বাংলা গান বা টপ্পা গান আয়ত্ত করার মত পরিণত নয়। বড়দাদু নাছোড়বান্দা। বললেন আমি মেয়েটাকে বড় মুখ করে বললাম আর আপনি ওকে ফিরিয়ে দেবেন? রামকুমার বাবু মুখটা ঘুরিয়ে আমার দিকে তাকালেন। কি জানি আমাকে দেখে বোধহয় একটু মায়া হল তাঁর। বড়দাদু কে বললেন - আমি আগে ওর গান শুনব তারপর দেখা যাবে। হাতের ইশারায় আমাকে বললেন - ভিতরে এস। গানের ঘরটি এতই ছোট যে আমাকে ঢুকতে হলে বড়দাদুকে বেরিয়ে আসতে হবে। আমি ঘরে ঢুকে ওনাকে প্রণাম করব বলে নীচু হতেই উনি আমাকে বললেন - সাবধান কুকুর আছে। উনি যে চেয়ারে বসে আছেন তার ঠিক নীচে লুঙ্গির আড়ালে শুয়ে আছে একটা লোমওয়ালা কুকুর। রামকুমার বাবুর খুব আদরের। 

                      
                                                      রামকুমার চট্টোপাধ্যায় ও তাঁর হারমোনিয়াম
 
 
 
                গোল শ্বেতপাথরের টেবিল টা পার হয়ে উলটো দিকের বসার জায়গাটা তে বসলাম। এবার বুকটা একটু ঢিপ ঢিপ করছে। ভয়টা দ্বিগুণ হয়ে গেল বাইরে বসে থাকা বাবার মুখটা দেখে। যদি উনি ফিরিয়ে দেন, তাহলে কি হবে কে জানে। বড়দাদুর প্রস্তাব শোনার পর থেকেই ক্যাসেট শুনে রামকুমার বাবুর কয়েকটি টপ্পা গান একটু রপ্ত করার চেষ্টা করেছিলাম। এছাড়া আমার ঝুলিতে আর কোন অস্ত্র নেই। এই অস্ত্র দিয়ে এই অসম লড়াই কিভাবে লড়ব এই সব ভাবতে ভাবতে রামকুমারবাবু আমার দিকে ঘুরিয়ে দিলেন হারমোনিয়াম। বললেন কোন স্কেল? আমি বললাম। ছাপোষা মধ্যবিত্ত পরিবারের বাবা মায়ের সন্তান, বাবা মায়ের শখে গান শেখা।  Scale changing হারমোনিয়াম এ গান গাইবার সৌভাগ্য হয় নি কখনো। উনি সস্নেহে হারমোনিয়ামটিতে আমার স্কেল বেঁধে দিলেন। বল দেখি কি গান শিখেছ? আমার বুকের ভিতরটা একেবারে হালকা হয়ে গেছে। সুর বেরোবে কিনা আমি জানিনা। হারমোনিয়ামটা বাজাতে শুরু করলাম। ভয়ে চোখ বুঁজে গিয়েছে। ক্যাসেট শুনে অনেক কষ্টে রপ্ত করা একটা গান - দেখা হলে ননদিরে বোল  - গাইবার প্রাণপণ চেষ্টা করলাম। একলাইন গাইবার পর মুখ চোখ বিকৃত করে রামকুমার বাবু বললেন - থামো। আমি বুঝলাম আমার সব আশা শেষ। উনি বললেন - ভজন শিখেছ কোন? গাও দেখি! বুঝলাম আমার গলায় নিজের গান শুনে যারপরনাই বিরক্ত হয়েছেন উনি। সব গুলিয়ে গিয়ে কিছুই মনে পড়ছে না। অনেক কষ্টে একটা সুরদাসের ভজন মনে পড়ল, গাইলাম। কিন্তু ঐ এক লাইন। আবার থেমে যেতে হল। এবার বললেন ভক্তিগীতি জানো? এবার আমার চোখে জল শুধু পড়তে বাকি আছে। বাইরে বসে আছে বাবা। একবার চোখ পড়তেই দেখলাম চোয়াল দুটো শক্ত করে বসে আছে দুজনেই। আমার যেন মনে হল এই ভক্তিগীতি আমাকে সমস্ত শক্তি দিয়ে গাইতে হবে। আমি গান ধরলাম - 
শ্মশান ভালোবাসিস বলে শ্মশান করেছি হৃদি
শ্মশানবাসিনী শ্যামা আসবি বলে নিরবধি
এবার দুলাইন শোনানোর সুযোগ মিলল। থেমে গেছে আমার গান। আমি মাথা নীচু করে বসে আছি। চারিদিকে যেন শ্মশানের নীরবতা। শুধু লোমওয়ালা কুকুরটা খাঁউ খাঁউ করে যাচ্ছে।  রামকুমারবাবুর শ্বেতপাথরের টেবিলের উপর একটা বড় কাঁচের গ্লাসে একগ্লাস লাল চা আর একটা ডালডার কৌটোয় বিস্কুট। কি যেন ভাবতে ভাবতে বেশ কয়েক চুমুক চা খেয়ে ফেললেন। আর তর সইল না বড়দাদুর। উঠে এসে জিজ্ঞাসা করলেন রামবাবু কি বুঝলেন? খুব রাগী চোখে বড়দাদুর দিকে তাকালেন। আমি যেন শুনতে পাচ্ছি উনি বলছেন - আমি তো আগেই আপনাকে বললাম ----। দুধের মত সাদা চুলের মধ্যে গোলাপ ফুলের পাপড়ির মত আঙ্গুল গুলো চালাতে চালাতে  গম্ভীর স্বরে বললেন - রবিবার করে পাঠিয়ে দেবেন, আমি শেখাব। অনেকক্ষণ ধরে আঁটকে থাকা চোখের জলের ফোঁটাটা এবার পড়েই গেল এই হারমোনিয়ামের উপর আর আমার জীবনের একটা বড় অধ্যায় হিসাবে সেই দিন থেকে রয়ে গেল শরৎ চন্দ্র সর্দারের নিজের হাতে তৈরী সেই হারমোনিয়াম। আমার গানের জগৎটারও  এই হারমোনিয়ামের মত স্থায়ী টিউনিং হয়ে গেল।

                                                                  আমার গান শেখার ফাঁকে



 
 











Saturday, 5 June 2021

কৃষ্ণাবল (Krishnawal)


                                     আরাধ্য দেবতা কে পরিবারের সদস্য হিসাবে দেখার রীতি হিন্দুধর্মের অন্যতম নীতিশিক্ষা। আর সেই শিক্ষা থেকেই আমাদের কারো ঘরে মহাদেব, কারো ঘরে কৃষ্ণ, কারো ঘরে নাড়ুগোপাল পূজিত হন পরিবারের সদস্য হিসাবেই। আমাদের যা যা খেতে ভালো লাগে, সেগুলোই তাঁদের নিবেদন করা হয়, আর প্রসাদ হিসাবে আমরা তার আনন্দ উপভোগ করি। পরিবারের আদরের শিশুটির মত করে যত্ন করা হয় তাদের। ঠিক সময়ে তাদের খাবারের ব্যবস্থা করা, ঠিক সময়ে শয়ন। পরিবারের শিশুটিকে যে পোশাকে সুন্দর দেখায়, নাড়ুগোপাল কে সেরকম পোশাক পরানো হয়। পরিবারের শিশুটি যেমন ক্ষুধার্থ থাকতে পারে না তেমনই নাড়ু গোপালকেও কোনওভাবেই ক্ষুধার্থ রাখা যাবে না, এরকম আরও কত কি! নিত্য ব্যবহৃত জিনিস বা খাবার দাবারের মধ্যে আরাধ্যদেবতার অংশ সন্ধান করার প্রচলনও আমরা দেখতে পাই। দেবভজনার বিভিন্ন গ্রন্থে এরকম হাজারো কাহিনীর সন্ধান পাওয়া যায়। মহারাষ্ট্রে  ভগবানের উদ্দ্যেশ্যে যে অখন্ড স্তুতি গান প্রচলিত আছে তার নাম অভঙ্গ (Abhang). অভঙ্গ শব্দের অর্থ নিরবিচ্ছিন্ন। মারাঠী দের অন্যতম আরাধ্য দেবতা হলেন বিট্টহোবা পান্ডুরঙ্গ (Bitthoba Panduranga). 

       এই দেবতা আদতে বিষ্ণুর অবতার রূপে পূজিত হন এবং কৃষ্ণ বর্ণের একজন স্বাস্থ্যবাণ যুবক হিসাবে তাঁর মূর্তি তৈরী করা হয়। প্রধানতঃ বিষ্ণুভক্তরাই পান্ডুরঙ্গের পূজা করে থাকেন। এই দেবতার স্তুতি গান বহু সন্ত এর abhang এ পাওয়া যায়, সন্ত তুকারাম যার অন্যতম। সন্ত তুকারাম তাঁর বিভিন্ন abhang এ বিট্টহল পান্ডুরঙ্গ কে পরিবারের সদস্য হিসাবেই তার স্তুতি গান করেছেন এবং নিত্যব্যবহৃত জিনিসের মধ্যে তাঁর অস্তিত্বের সন্ধান করেছেন। 

                          এমনই একটি abhang  এ তিনি কৃষ্ণাবল (Krishnawal) নামক একটি জিনিসের উল্লেখ করেছেন। কিন্তু এমন একটি জিনিসের মধ্যেও যে কৃষ্ণের সন্ধান পাওয়া যেতে পারে এই ভাবনা শুধুমাত্র কোন পরমভক্তের মনেই আসা সম্ভব। কৃষ্ণাবল (Krishnawal) শব্দের অর্থ ভগবান শ্রীকৃষ্ণের প্রতীক। চতুর্বাহু ভগবান বিষ্ণু তাঁর চার হাতে চারটি জিনিস ধারণ করেন - শঙ্খ, চক্র, গদা এবং পদ্ম। এই চার বস্তু একত্রে বিষ্ণুর প্রতীক। কৃষ্ণাবল (Krishnawal) আমাদের রান্নাঘরে থাকা এমন এক বস্তু যার মধ্যে আমরা একত্রে এই চারটি জিনিস  দেখতে পারি। ভগবানের প্রতি ভক্তের অনুরাগ কত প্রগাঢ় হলে তবেই সব কিছুর মধ্যে আরাধ্য দেবতার সন্ধান পাওয়া যায় এ বোধহয় তারই নিদর্শন। 

                               কৃষ্ণাবল (Krishnawal) শব্দটির উল্লেখ দক্ষিণের কিছু ভাষা র মধ্যেও পাওয়া যায়। এই শব্দের অর্থ হল - পেঁয়াজ। পেঁয়াজ কে বিভিন্ন ভাবে কাটলে তার মধ্যে ভগবান বিষ্ণুর চারটি অস্ত্রের সন্ধান পাওয়া যায়। লম্বা করে কাটলে শঙ্খ, আড়াআড়ি কাটলে চক্র, গোটা হাতে ধরলে গদামুন্ড এবং ভিতরের স্তর গুলো আলাদা করলে তা পদ্মের আকার পায়।

 

শঙ্খ চক্র

                                


  গদা                                                                                        পদ্ম 

                                           এতো গেল শাস্ত্র কথা। এবার আসা যাক ইতিহাসে। হোল্কার সাম্রাজ্যের রাণী অহল্যাবাঈ ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী এবং  বুদ্ধিমতী। মল্লার রাও হোল্কার তাঁর দূরদর্শিতার মাধ্যমে অহল্যার মধ্যে প্রচুর সম্ভাবনা দেখেন এবং খুব ছোট্ট বয়সে তাকে পুত্রবধু হিসেবে মালব্য দেশে নিয়ে আসেন। অহল্যাবাঈ ইতিহাস রচনা করার জন্যই জন্মগ্রহণ করেছিলেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর সংসার জীবন ছিল অত্যন্ত কঠিন। সমস্ত প্রচলিত প্রথা কে নতুন করে ভাবা এবং সে সমস্ত প্রথা কে সংস্কার করার অদম্য ইচ্ছা পূরণ করতে অহল্যা কে বহু বাধার সম্মুখীন হতে হয়। মাত্র নয় বছর বয়সে তিনি প্রশ্ন তোলেন স্ত্রী রা কেন শিক্ষার অধিকার পাবে না।  এই বয়সের নিতান্ত একজন শিশুর মুখে এমন সমাজ সংস্কারের কথা স্বাভাবিক ভাবেই রাজ পরিবারের কেউ সমর্থন করেন নি। কিন্ত মল্লার রাও অহল্যার শিক্ষার ব্যাপারে অত্যন্ত আগ্রহী ছিলেন কারণ ভবিষ্যতে মালব্য প্রদেশের রাণী হওয়ার সম্ভাবনা তিনি এই ছোট্ট মেয়েটির মধ্যে দেখেছিলেন। নিজেকে শিক্ষাগ্রহণের যোগ্য প্রমাণ করার জন্য, অহল্যাকে রাণী গৌতমার দেওয়া চারটি অত্যন্ত কঠিন প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়েছিল।  কৃষ্ণাবল (Krishnawal) ছিল সেই প্রশ্নমালার তৃতীয় প্রশ্ন যা একটি নয় বছরের অক্ষরজ্ঞানহীন বালিকার পক্ষে একেবারেই অসম্ভব ছিল। কিন্তু ছোট্ট অহল্যা তাঁর বুদ্ধিমত্তা দিয়ে এই কঠিন প্রশ্নের সমাধান করেছিলেন এবং   ভারতের নারীশিক্ষাকে একটি ঐতিহাসিক স্তরে উন্নীত করতে পেরেছিলেন। আজকের ভারতীয় নারী যে সম্মান, যে অধিকার পেয়ে থাকেন তার এক শক্ত বুনিয়াদ গড়ে দিয়েছিলেন রাণী অহল্যাবাঈ।




                       

                                                                          
                                                                                                                  


Wednesday, 19 May 2021

শেষ কোথায়

                            সেদিন ছবির ঝাঁপি ঘাঁটতে ঘাঁটতে অনেক পুরনো ছবি খুঁজে পেলাম। জীবনের বিভিন্ন সময়ে কত সুন্দর  সব অভিজ্ঞতার আস্বাদ পেয়েছি। আজ যেন সে সব কল্পনারও অতীত। অনেক লড়াইয়ের পর অধ্যাপনা করার সুযোগ যদিও বা মিলল, তাতে শুরু  হল নতুন এক লড়াই। নিত্য যাত্রার লড়াই। মাঝ রাতে ঘুম থেকে উঠে চাকরি করতে যাওয়া, তাও কলকাতা থেকে বেশ অনেকটা দূরে। প্রথম কিছুদিন কষ্ট হলেও পরে এই নিত্যযাত্রা ক্রমশঃ বড় আনন্দের হয়ে উঠল। বড় মধুর ছিল আমাদের সেই চাকরি জীবন। সহকর্মীরা কেউ বয়সে বড় হলেও পরম বন্ধু, কেউ অভিভাবক কেউ বা সহমর্মী। সব টা মিলিয়ে একঝাঁক মানুষ, যাদের সঙ্গ  ছিল উপভোগ করার মত। তার মধ্যে আবার কয়েকজন ছিল যাদের মুক্তি ছিল আকাশে। এদের নিয়ে এক ছোট্ট দল ছিল আমাদের, কোথাও যাদের হারিয়ে যাওয়ার মানা ছিল না। 

                         সেবার অধ্যাপকদের রাজ্যসম্মেলনে গেছিলাম বালুরঘাট। সম্মেলনের অছিলায় নিছক বেড়াতে যাওয়া।  বালুরঘাট থেকে  ইন্দো বাংলাদেশ সীমান্তের হিলি তে। বড় অদ্ভুত এ জায়গায় সীমান্তের বন্টন। হিলি স্টেশনের প্লাটফর্ম পড়ে ভারতে তো রেললাইন বাংলাদেশ। বেশ সুন্দর গ্রাম্য পরিবেশ। আমরা যখন স্টেশনের কাছে পৌঁছলাম তার কিছুক্ষণের মধ্যেই একটা ট্রেন আসবে , বাংলাদেশের ট্রেন। রেললাইনের দুই পাশে দুই দেশ। অসংখ্য মানুষ দাঁড়িয়ে আছে লাইনের দু ধারে। আমরা কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছিলাম না যে ট্রেনে যারা চড়বে তারা প্ল্যাটফর্মে না দাঁড়িয়ে লাইনের পাশে কেন দাঁড়িয়ে আছে! এরপর আকাশ কাঁপানো আওয়াজ করে আসতে লাগল বাংলাদেশের ট্রেন। দূর থেকে ট্রেন আসছে দেখেই হাজার হাজার মানুষ নেমে পড়ল রেললাইনে। চলন্ত ট্রেনের একেবারে সমনে দিয়ে জীবন হাতে করে মানুষ গুলো পৌঁছে গেল একদেশ থেকে আর এক দেশে। সে দৃশ্য দেখে গায়ে যেন কাঁটা দিয়ে উঠেছিল। রেললাইনের দুধারে দুদেশের সীমান্ত রক্ষী বাহিনী নিরূপায় হয়ে দেখতে লাগল মানুষের এই দেশবদল। ট্রেন চলে যাওয়ার পরে যেন যুদ্ধ শেষের নীরবতা। কিছু মানুষের সাথে কথা বলে জানতে পারলাম এই পারাপার নাকি রোজের ঘটনা। চিনি, নুন, চাল, সুতির শাড়ি এ সমস্ত জিনিস দুদেশের মানুষের মাধ্যমে চলে যায় দেশান্তরে। অনেক সময় অনেকে পৌঁছতে না পেরে ধরা পড়ে রক্ষীদের হাতে, কেউ বা ঝাঁপ দেয় পাশের পুকুরে। প্রাণও চলে যায় কখনো বা। কিন্তু ঠিক ট্রেন ঢোকার মুহুর্তে সীমান্ত রক্ষীর চোখ এড়িয়ে পার হতে না পারলে আর পার হওয়ার কোন উপায় নেই মানুষের। বড় অদ্ভুত লেগেছিল ভেবে বছরের পর বছর মানুষ এভাবে কি করে বেঁচে আছে!। কয়েকজন মহিলা কে দেখলাম অনেকগুলো শাড়ি পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে পরে দাঁড়িয়ে আছেন ট্রেন আসার আপেক্ষায়। এভাবেই তাদের সাথে দেশান্তরে যায় সুতির শাড়ি। নিজের চোখে না দেখলে কোনদিন বিশ্বাস করতে পারতাম না।   এভাবেই পারাপারের জীবন কাটায় এই গ্রামের মানুষগুলো। ট্রেন চলে যাওয়ার পর আমরা বেশ কিছুক্ষণ সময় কাটালাম গ্রামের বাচ্ছা গুলোর সঙ্গে। দেখা মিলল দুই সহোদর ভাইয়ের  - একজন রাম আর একজন কবীর। 

                        আজ মনে হয় দিন গুলো যেন স্বপ্ন ছিল। মাথার উপর ছাতার মত থাকা সেই সহযাত্রীরা আজ যে যার বৃত্তে আবদ্ধ। আজও হয়তো সেই ট্রেন আসে, মানুষজন পারাপার করে, কিন্তু রাম আর কবীরের কথা জানতে আর কেউ যায় কি! অজানা অচেনা সীমান্তে নির্ভয়ে হারিয়ে যাওয়ার মন নিয়ে মুক্তির নেশায় ছুটে যায় কি কেউ ? আজও! নির্দ্বিধায় ভরসা করার সেই কাছের মানুষ গুলো আজ যেন কত দূরে। মহামারীর রাক্ষুসে চোখ সবাইকে যেন ছুঁড়ে ফেলেছে ভিন্ন ভিন্ন গ্রহে। পৃথিবীর চেনা ছবিটার সব রঙ ছিনিয়ে নিয়ে ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে সম্পর্কের সব বন্ধন। অনিশ্চয়তার পথে চলতে চলতে, প্রিয় জনকে হারাতে হারাতে একটাই প্রশ্ন মোচড় দিয়ে ওঠে - পথের শেষ কোথায়!



Monday, 25 January 2021

মা যশোদা

             ছোট থেকে বড় হতে হতে অনেক কিছুই  পাল্টে গেল। সবচেয়ে বেশি করে বোধহয় পাল্টে গেলাম আমরা। যে নিবিড় পারিবারিক নির্ভরতা আর নিখাদ স্নেহ ভালোবাসা দিয়ে আমাদের ছোটবেলা কেটেছে, কোথাও গিয়ে যেন সব তালগোল পাকিয়ে গেল। আজ পিছন ফিরে তাকালে স্মৃতির সমুদ্র থেকে উঠে আসে অমূল্য সব সম্পদ, আমাদের জীবনীশক্তির পরশপাথর। এমনই এক সম্পদ আমার বড় মাইমা। জীবনে কোনদিন তাঁকে মাইমা বলে ডাকিনি। মা যেহেতু বৌদি ডাকেন, তাই মাইমা চিরকাল আমারও বৌদি। শুধু ডাকে নয় বৌদিকে বোধহয় কোন কিছুতেই কখনও মায়ের থেকে আলাদা করা যায় নি। মায়ের কাছে গল্প শুনেছি আমার শৈশবের কঠিন অসুখ থেকে সমস্ত রকম বায়না বা আবদার পরম বাৎসল্যের সঙ্গে সামাল দিত বৌদি। মা চোখ বড় করে তাকালে  শাড়ীর খুঁট ধরে বৌদির আড়াল ছিল সবচেয়ে নিশ্চিন্ত আশ্রয়। 


               প্রত্যন্ত গ্রামে মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম হয়েছিল বৌদির। লেখাপড়ার সুযোগ ঠিকমত পেয়ে ওঠার আগেই আমার মামার বাড়ির বিশাল যৌথ পরিবারের বড় বউ হয়ে চলে আসে পাকুড়তলার বিভারাণী। শুরু হয় সংসার সংগ্রাম। দেওর ননদের ভরপুর সংসারে বৌদির ভূমিকা, শরৎবাবুর উপন্যাসের বড় বউ এর থেকে আলাদা কিছু ছিল না। নম্বর ধরে ধরে দেওরদের সম্বোধন করত বৌদি। মেজ, সেজ, ন, ছোট। উচ্চারণে উহ্য থাকলেও দেওর রা বৌদির আপন ভাই এর চেয়ে কম কিছু ছিল না। দেওর ননদের পাছে কষ্ট হয় তাই নিজের বাপের বাড়ির কথা একপ্রকার ভুলেই গিয়েছিল বৌদি। ধীরে ধীরে সমস্ত পরিবারটা সযত্নে নিজের হাতে গুছিয়ে তুলে ক্রমশঃ বৌদি থেকে কখন যেন পরিবারের মা হয়ে গেল বিভারাণী। 

             আমার ছোটবেলা কেটেছে বৌদির শাসন আর স্নেহের এক অদ্ভুত মিশেলের মধ্যে দিয়ে। কোন একটা অন্যায় করে ছুট্টে পালালে পিছন পিছন মিলিটারি মেজাজে ছুটে আসত বৌদি। হাতে গরম খুন্তি আর মুখে একটা অদ্ভুত শব্দ করে বলত - হারামজাদী। এ শব্দের মানে তখন বুঝতাম না। আজ বুঝি  এটা বকুনি নয় নিছক আহ্লাদ। কি যে আনন্দের খেলা ছিল! দুধের চাঁচি থেকে মাছের আঁশ ভাজা, গোল গোল বেগুন ভাজা থেকে মুচমুচে তালের বড়া, আমের মিষ্টি আচার থেকে বড় বড় রসবড়া, যত বায়না সব বৌদির কাছে। গরমের দুপুরে নিয়ম করে লোডশেডিং আর বৌদির হাতের তালপাতার পাখা যেন একে অপরের পরিপূরক। এক মিনিটের জন্যও থামত না সে পাখা। পাছে আমার ঘাম হয়ে সর্দি লাগে। বৌদির ছেলে, মেয়ে আর আমি এই ছিল আমাদের পিঠোপিঠি ভাইবোনের বৃত্ত। কোন একটা কারণে খুনসুটি বাঁধিয়ে ভাইকে বকুনি খাওয়ানোর মজাই ছিল আলাদা। ভাগ্নীর মনোরঞ্জনের জন্য নিজের সন্তানকে শাসন করার মত মা, আজ সত্যিই বিরল। আটপৌরে শাড়ি ছাড়া অন্য কিছু তে দেখলে বৌদিকে চিনতে একটু অসুবিধাই হত। আমার নাছোড়বান্দা স্বভাবের জন্য বৌদির পানের নেশাও কখনও প্রশ্নের মুখে পড়ে যেত। এটা খেলে ওটা হবে এরকম অনেক কিছু বলেও যখন আমাকে জর্দাপানের বায়না থেকে নিরস্ত করা যেত না, তখন চুনের বাটিতে ডুবিয়ে হাতে দিত একটা পানের বোঁটা। সে যেন বিজয় পতাকা। কিছু তো পাওয়া গেল! আমার বাড়ি আর মামার বাড়ির দুরত্ব খুব বেশি ছিল না। তাই ভালমন্দ রান্না হলে আমার ভাগের টা সঠিক সময়ে পৌঁছে দিতে বৌদির যেমন কখনও ভুল হত না, তেমনই কখনও ভুল হত না পাত্রের ঢাকার উপর এক চিমটে নুন দিতে, পাছে কারো নজর লাগে।

               ছোটবেলার এই অভ্যাস বড় হয়েও বদলায় নি। জীবনের সমস্ত ওঠা পড়ায় বৌদি ছিল একান্ত নিবিড় আশ্রয়। কাজের চাপে বৌদির কাছে নিয়মিত যাওয়ার রুটিন বদলে যায়। বৌদির জীবনেও নেমে আসে নানা ঘাত প্রতিঘাত। পরিবারে ঢুকে পড়ে টুকরো হওয়ার কর্কট রোগ। উপর্যুপরী স্বজন হারানোর শোক আর সংসারে ক্রমশঃ বাতিলের দলে চলে যাওয়া বৌদি, ক্রমশঃ অশক্ত হয়ে পড়ে। আমার বাবা মা পছন্দ করতেন না বলে আমার কোন ডাক নাম নেই। কিন্তু সবাই আমাকে যেভাবে দেখে, তার থেকে বৌদির চোখে আমি ছিলাম একটু আলাদা। আমার জন্ম বৃহস্পতিবারে এ কথা সবাই জানে কিন্তু একমাত্র বৌদিই  বোধহয় আমার লক্ষ্মীশ্রীর সন্ধান পেয়েছিল। আমার একটা ডাক নাম হয়েছিল - লক্ষ্মী। জীবনে কোনদিন বৌদি আমাকে আমার পোশাকী নামে ডাকে নি।


                    ২০২০ সালের শেষ দিনে, বছরের বিষের ভার সঙ্গে নিয়ে তেমনই এক বৃহস্পতিবারে আমাদের সকলকে লক্ষ্মীছাড়া করে চলে গেল আমার মামার বাড়ির গৃহলক্ষ্মী। আমার পরম নিশ্চিন্ত আশ্রয় পৌঁছে গেল ঈশ্বরের পরম শান্তির আশ্রয়ে।  আমার মা যশোদা - তুমি খুব ভালো থেকো, শান্তি তে থেকো!




Saturday, 23 January 2021

জবাব

                        পূর্বজন্ম বলে যদি কিছু থাকে তাহলে তার প্রারব্ধ হিসাবে এ জীবনে বেশ কিছু সত্যিকারের মানুষের সান্নিধ্যে আসার সুযোগ আমার হয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম উল্লেখযোগ্য হলেন আমার সঙ্গীতের শিক্ষাগুরু পরমারারাধ্য স্বর্গীয় রামকুমার চট্টোপাধ্যায়। পুরোনো কলকাতা আর বাঙালীয়ানার বিভিন্ন তথ্যের খনি ছিলেন রামকুমার বাবু। ওনার গল্প বলার স্বকীয় ভঙ্গী, ওনার কাছে গান শেখার মতই চিত্তাকর্ষক ছিল আমার কাছে। একটা গল্পের কথা মনে পড়ে গেল আজ।

                           রামকুমার বাবু গানের জগতে খ্যাতি পেয়েছেন বেশ অনেকটা বয়সে। রামনিধি গুপ্ত বা নিধুবাবুর জীবনের উপর তৈরী একটি চলচ্চিত্রে গাওয়া নিধুবাবুর টপ্পা, তাঁঁকে নিয়ে গিয়েছিল খ্যাতির চুড়ায়। দিয়েছিল এক স্বতন্ত্র পরিচিতি। এমনই এক সময়ে যখন তাঁর বেশ নামডাক, তাঁকে গান গাইতে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল কলকাতার একটি বিখ্যাত কলেজের বার্ষিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে। বলা বাহুল্য অধ্যাপকদের পছন্দের শিল্পী হিসাবে আমন্ত্রিত হলেও ছাত্রদের কাছে তিনি খুব একটা গ্রহণযোগ্য ছিলেন না। যা হোক নির্ধারিত সময়ে যথেষ্ট সম্মানের সঙ্গে অনুষ্ঠান স্থলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল তাঁকে। অনুষ্ঠান শুরু হয়, একের পর এক অনুষ্ঠান চলতে থাকে। একের পর এক শিল্পী তাঁদের পরিবেশনা করে যেতে থাকেন। প্রায় ঘন্টা তিনেক বসে থাকার পরেও রামকুমার বাবুর নাম ঘোষণা হয় না। ওনার সঙ্গতকারী শিল্পীরা স্বভাবতঃই বিরক্ত হতে থাকেন। কিঞ্চিত অপমানিতও বটে। কিন্তু গায়ক নিজেই যখন নির্বিকার তথন তাদের আর কিই বা করার আছে! অবশেষে প্রায় রাত দশটা নাগাদ নায়কোচিত ভঙ্গীতে একজন ছাত্র ঘোষণা করেন - ' এখন আপনাদের সামনে নিধিরাম সর্দারের গান শোনাতে আসবেন রামকুমার চট্টোপাধ্যায়'। এমন শ্রীহীন বিকট ঘোষণা শুনে অধ্যাপক রা হায় হায় করে ওঠেন। কিন্তু অনুষ্ঠানের ছন্দোপতন হবার ভয়ে কেউ কিছু বলেন না। সঙ্গতকারী শিল্পীরা একপ্রকার জেহাদ ঘোষণা করেন তাঁরা কিছুতেই মঞ্চে উঠবেন না । রামকুমার বাবু সহাস্যে দর্শকের উদ্দেশ্যে করজোড়ে প্রণাম করে মঞ্চে উঠলেন। দর্শকাসনের পিছন দিকে শুরু হল গুঞ্জন। নড়াচড়া শুরু,  শুরু হল বিক্ষিপ্ত শৃঙ্খলাভঙ্গ। রামকুমার বাবু তাঁর নিজস্ব কায়দায় বাঁ হাত সামনে তুলে উচ্চ কণ্ঠে গান ধরলেন -

 'যমুনায় জল আনতে যাচ্ছ, সঙ্গে নেই তো কেউ - তুমি কাদের কূলের বউ গো তুমি কাদের কূলের বউ'

              দ্রুত লয়, সারেঙ্গীর মোচড় আর চড়া সুরে বাঁধা তবলার বোল। সেই সঙ্গে শিল্পীর সুরের মাদকতায় সমস্ত রঙ্গমঞ্চ মুহুর্তের মধ্যে ফিরে পেল বাঙ্গালীয়ানার ছন্দ। উশখুশ করতে থাকা ছাত্ররা জমিয়ে হেলান দিয়ে বসল মহাজাতি সদনের চেয়ারে। উনি গানটি শেষ করে যখন থামলেন, তখন কিছুক্ষণের জন্য অস্বাভাবিক নীরবতা, যেন ছুঁচ পড়লে শব্দ হবে। কিছু সময় পরে দর্শকাসনের শেষ দিক থেকে ভেসে আসল হাততালির রোল। মুহুর্তের মধ্যে সমস্ত রঙ্গমঞ্চ মেতে উঠল প্রশস্তির কলরোলে। রামকুমার বাবু মাথার উপর হাত তুলে প্রণাম করলেন সমস্ত দর্শককে। মুখের হাসি মুখেই রেখে উঠে পড়লেন। দর্শকরা হই হই করে উঠেছে - আমরা আপনার গান আরও শুনতে চাই। মাইক্রোফোন এর কাছে মুখ এনে এক মুখ হাসি নিয়ে রামকুমার বাবু বললেন - "অনেক রাত হয়েছে তো, আজ নিধিরাম সর্দারের ছুটি। আমি বাড়ি না গেলে বাড়িতে চোর-ডাকাত ঢুকতে পারে, আমায় মার্জনা করবেন।"

           

                  আজ বাংলা মায়ের এক কীর্তিমান সন্তানের জন্মদিবসে আমার দেখা আপাদমস্তক আত্মমর্যাদার মোড়া আর এক বাঙালীর কথা মনে হতেই মনটা ভরে গেল এক অদ্ভুত প্রশান্তিতে। পুরাতনী গানের এই সুরের যাদুকরকে শতকোটি প্রণাম।


                                   🙏 🙏 🙏 🙏

          



Monday, 14 December 2020

কল্যাণীয়া

                        জীবনের বেশ অনেকটা সময় হাওড়া জেলার বেলুড়ে কেটেছে।  রামকৃষ্ণ মিশনের দৌলতে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন হলেও আন্তর্জাতিক মানের পরিকাঠামো পাওয়ার সৌভাগ্য বেলুড়বাসীর বিশেষ হয়নি। ছোটবেলায় যখন শুনেছিলাম কলকাতা যেতে হলে আস্ত একটা নদী পেরোতে হয়, তখন মনে হত কলকাতায় যারা থাকে তারা ভিনগ্রহের বাসিন্দা। এমনই ভিনগ্রহের বাসিন্দা ছিল আমাদের পরিবারের একটি অংশ। আমার বড় জেঠু স্বর্গীয় শ্রী গোপীচাঁদ বন্দ্যোপাধ্যায় এর পরিবার। পরিবারের সবার বড় হিসাবে জেঠু সকলের কাছে একটু বেশি রকমের সম্ভ্রম পেতেন। বাবার কাছে গল্প শুনেছি আমাদের পরিবারে বড় জেঠুর অনেক অবদান। স্বাভাবিক ভাবেই পরিবারের কোন জমায়েতে যখন জেঠু সপরিবারে আসতেন, একটা অন্যরকম পরিবেশ তৈরী হত । একটু বড় হওয়ার পর বাবা বললেন চল জেঠুর বাড়ি নিয়ে যাব। সে তো যেন বিদেশ যাওয়ার আনন্দ। কত কিছু নতুন। হাওড়া স্টেশন, সেখান থেকে দোতলা বাসে চড়া। তখন কলকাতায় মেট্রো চালু হয়নি। জেঠুর চেতলার বাড়িতে যেতে দোতলা বাসে চড়তে হত। বাসের দোতলার একদম সামনের সিটটা পাওয়া যেন দুটো পাখনা পাওয়ার সমান। কি যে আকর্ষণীয় ছিল সেই জেঠুর বাড়ি যাওয়া! জেঠুর বাড়ি পৌঁছে দেখলাম বাড়ির মাথা দেখা যায় না। আমার মত ছোট মানুষ কতটাই বা ঘাড় উঁচু করতে পারে!। বাবা প্রায় আকাশের কাছে একটা বারান্দা দেখিয়ে বললেন ওইটা জেঠুর বাড়ির বারান্দা। আমার স্বতঃস্ফুর্ত প্রশ্ন - কি করে উঠব ? বাবা বললেন চল না দেখবি লিফট চড়াব। পায়ে পায়ে রহস্যভেদ করতে করতে চলেছি বাবার হাত ধরে। বিস্ময়ের পর বিস্ময়। একটা গে্ট লাগানো বাক্সের মধ্যে ঢুকে পড়লাম। টুলে বসে থাকা একজন ভদ্রলোক গেট টা টেনে একটা বোতাম টিপতেই বাক্সটা উপরে উঠতে লাগল। প্রথম ধাক্কায় ভয় পেয়ে বাবার প্যান্ট খিমচে ধরেছি, তারপর দেখলাম বাহ বেশ মজা তো!। একটার পর একটা সিঁড়ি ফেলে কেমন তর তর করে উঠে যাচ্ছে বাক্সটা। সত্যি কলকাতায় থাকার কি মজা!। এরপর থেকে অপেক্ষা করে থাকতাম কবে জেঠুর বাড়ি আসা হবে, আর এই বাক্সটায় চড়ে উপর নীচ করা যাবে। কলকাতায় থাকার সুবাদে আমার জেঠিমা, আমার মা কাকিমাদের থেকে একটু অন্যরকম। জেঠিমার হাঁকডাক, বেলুড়ের মশার সাথে কলকাতার মশার তুলনা,  অসম্ভব ভুল হিন্দি বলার পর দম ফাটানো হাসি আর বেলুড় গাঁঁয়ে থাকি বলে আমাদের প্রতি একটু উপহাস সব মিলিয়ে জেঠিমার বর্ণময়  উপস্থিতি বেশ উপভোগ্য ছিল। 

                          জেঠিমার দিদি ছিলেন সেকালের সাড়া জাগানো অলিম্পিক সার্কাসের মালিক। দক্ষিণেশ্বরে জেঠিমার দিদির বাড়ি যাওয়া ছিল আর এক আকর্ষণ। বাড়িতে ঢুকতেই একটা আস্ত বাঘ দেখে হাড় হিম হয়ে যেত। না সত্যিকারের বাঘ নয়, খড়ের কাঠামোয় সত্যিকারের বাঘের চামড়ার আস্তরণ। কিন্তু এত নিখুঁত যে বাড়িতে ঢুকতে হলে অতি বড় সর্দারকেও একবার থমকে দাঁড়াতে হবে। সেই দিদির বাড়িতে কতগুলো ঘর আছে তার হিসেব বোধহয় তিনি নিজেও জানতেন না। লম্বা বারান্দা দিয়ে বেশ কয়েকটা  ঘর পার হয়ে চলেছি, চারিদিকে দেখছি আর বোঝার চেষ্টা করছি সার্কাসের মালিক হলে ঠিক কতটা বিত্তবান হওয়া যায়।  পায়ে পায়ে অনেকগুলো বেড়াল ছানা ঘুরে বেড়াচ্ছে। অবাক হয়ে জেঠিমা কে বলি বাবা বেড়াল গুলোর কি চেহারা গো! জেঠিমা আমার এই বোকার মত কথায় খুব মজা পায়। ওরে এগুলো বেড়াল নয়, বাঘের বাচ্ছা! বুকের মধ্যে কেউ যেন সজোরে এক ঘুঁষি মারল - বলে কি! একে তো কলকাতাবাসী তায় সার্কাসের মালিকের ঘরের লোক, জেঠিমা যেন আক্ষরিক অর্থেই অধরা। 

                            জীবনের নাগরদোলায় ঘুরতে ঘুরতে জেঠিমার সাথে যোগাযোগ অনেকটাই ফিকে হয়ে গিয়েছিল। কথা প্রসঙ্গে জেঠিমার কথা উঠলেই জেঠিমার সেই চোখমুখ বেঁকিয়ে বলা  - 'ফাস কেলাস' - সকলের কানে বাজত। বারান্দা পরিস্কার করতে গিয়ে পাখিগুলোর সাথে আবোল তাবোল বকতে থাকা জেঠিমার কথা, প্রায়ই ঘুরে ফিরে বেড়াত সকলের মধ্যে। টুকটাক শরীর খারাপের খবর, বয়সজনিত অসুস্থতার খবর মাঝে মাঝেই একজনের থেকে একজনের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ত ফোনে ফোনে। বহু বছর পর জেঠিমার অসুস্থতার খবর পেয়ে গেলাম সেই বাড়িটায়।  বিস্ময়ের আর  কিছু নেই, বরং মলিন হয়ে যাওয়া সেই ঝকঝকে বাড়িটা দেখে মনটা খারাপই হয়ে গেল। অবশেষে দ্বাদশ মাসের দ্বাদশ দিনে ইহলোকের সমস্ত কল্যাণ অকল্যাণের ঊর্ধে চলে গেলেন আমাদের পরিবারের বড় বউমা  - কল্যাণীয়া কল্যানী বন্দ্যোপাধ্যায়। ফাস কেলাস থেকো জেঠিমা।

বদল

                বছরখানেক আগে ইমন  কথা দিয়েছিল বিলাবলকে তার সাথে কখনো পলাশ দেখতে যাবে। সারাবছরের ঘোড়দৌড়ের মধ্যেও সে কথা ভোলেনি ই...