About Me

My photo
Kolkata, West Bengal, India

Friday, 23 July 2021

অদলবদল

              আজ সকাল থেকে আকাশটা কেমন মনমরা। একপশলা ভোরের বৃষ্টিতে ভিজে  গাছগুলোর ঘুম বোধহয় একটু তাড়াতাড়িই ভেঙ্গে গেছে। রাস্তার ধারের লাল রঙ্গন ফুলের গাছটা ফুলের ভারেই বুঝি মূর্ছা যাচ্ছে। সকালে হাঁটতে আসা মানুষের দলগুলো আজ অনেকটাই হালকা। ম্যাজম্যাজে দিনটা আজ বোধহয় একটু দেরী করেই শুরু হবে। সমস্ত স্বাস্থ্যবিধি উড়িয়ে যে চায়ের দোকানগুলো রোজ এ সময় ভিড়ে উপচে পড়ে আজ সেখানেও যেন একটু অন্য ছবি। রাস্তার ঠিক মাঝখানে বিশাল এক যন্ত্র তিনদিন ধরে অবিরাম গর্ত খুঁড়ে চলেছে। নাগরিক পরিষেবা। দুপাশের বাড়ির লোকগুলোর প্রাণান্তকর অবস্থা।


                      আজকাল দুয়ারে বাজারের এত প্রচলন যে মানুষের বাজার যাওয়ার তাড়াও আর বিশেষ নেই। প্রতিটা বাড়ির বারান্দায়, উঠোনে, বাড়ির সামনের রাস্তায়, গলির মোড়ে মা - কাকিমা রা অপেক্ষা করেন তাঁদের পছন্দের সবজিওয়ালা, মাছওয়ালা আসবে। রোজ দেখা হতে হতে কেমন একটা হালকা হাসির পরিচয় হয়ে গেছে ওদের সাথে। কয়েকদিন না দেখতে পেলে জিজ্ঞাসা করেন - কি ব্যাপার সব ঠিক আছে তো!  ঘাড় নেড়ে কিংবা হাত নেড়ে দিয়ে যাই কুশল সংবাদ। আজ হাঁটতে হাঁটতে একটু অন্যদিকে চলে এসেছি। এখানেও মা কাকিমাদের একই রকম ছবি, কিন্তু এদের সাথে আমার হালকা হাসির পরিচয়টুকুও নেই। হঠাৎ চোখে পড়ল একটা বাড়ির সামনের রাস্তায় একজন শীর্ণকায় বয়স্ক মহিলা দাঁড়িয়ে আছেন। দুয়ারে বাজারের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছেন বলে মনে হল না। সামনে দিয়ে যে ই যাচ্ছে কি যেন একটা জিজ্ঞাসা করছেন, কিন্তু কেউই ওনার কথার জবাব দিচ্ছে না। চলে যাচ্ছে নিজের মত। পায়ে পায়ে এগিয়ে আমিও ওনার ঠিক সামনে এসে পড়েছি প্রায়। আমার আগে যে মহিলা চলে গেলেন তিনিও ওনার প্রশ্নের উত্তর দিলেন না কিন্তু আমি প্রশ্নটা শুনতে পেলাম - "আজ শুক্রবার?" মনে হল আজ তো শুক্রবারই। এই রকম একজন বয়স্ক মানুষের প্রশ্নের উত্তরে একটা হ্যাঁ বলার জন্য কারো হাতে ফুরসত নেই! আমি ওনার সামনে আসতেই একই প্রশ্ন আমাকে করলেন উনি আমি দাঁড়িয়ে বললাম - হ্যাঁ মাসীমা আজ শুক্রবার। উনি ফোকলা দাঁতে একগাল হেসে বললেন - "ছেলে আসবে তো তাই"। আমারও মনটা কেমন অজানা খুশিতে ভরে গেল। আর একবার ঘুরে তাকালাম ছেলের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকা 'মা' কে দেখার জন্য। 

                 হনহন করে হেঁটে পেরিয়ে যাচ্ছিলাম আমার আগের মহিলাকে। উনি আমায় জিজ্ঞাসা করলেন - দিদি ঠাকুমা কি জিজ্ঞাসা করছিল? আমি সবটাই বললাম। বলল - রোজ সবাইকে জিজ্ঞাসা করে জানেন তো! আমরা আজকাল আর উত্তর দিই না। আপনি উত্তর দিলেন তো আপনাকে রোজ জিজ্ঞাসা করবে। মনে মনে ভাবলাম কি বাহাদুরী করেন উত্তর না দিয়ে। ভদ্রমহিলা বলে চলেছেন। আমার হাঁটার গতিও থেমে গেছে। আসলে ঠাকুমার একটাই ছেলে জানেন তো। সবজির লরি চালায়। শুক্রবার করে এসে মা'কে সারা সপ্তাহের খরচ দিয়ে যায়। দিনকুড়ি আগে এক্সিডেন্টে ছেলাটা মরে গেছে। ঠাকুমা জানে না। 

                  আমার পা দুটো আর চলছেই না। অনেকটা এগিয়ে এসেছি, ছেলের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকা মা'কে আর দেখতে পাচ্ছিনা। গলাটা যেন বুঁজে আসছে। হা ঈশ্বর এ কেমন বিচার! সেদিন এক বন্ধুর লেখা গল্প 'এক্সচেঞ্জ অফার'  পড়ছিলাম। সমস্ত পুরোন অচল জিনিস বদলে ঝাঁ চকচকে জিনিসে ঘর ভরিয়ে দিতে পারেন কোম্পানীর সাহেব মালিক। বাড়ির অশীতিপর বাতিল হয়ে যাওয়া দাদুকেও তিনি বদলে দিতে চান। এমন কোন গঞ্জালভেস কি পারেনা  অনন্ত অপেক্ষার বদলে এই মাকে ঝাঁ চকচকে সুন্দর একটা ভবিষ্যৎ দিয়ে যেতে? যাতে উনি আর যে কটা দিন বাঁচবেন ওই ফোকলা দাঁতের হাসিটা নিয়ে বাঁচতে পারেন? কিন্তু না। পৃথিবীতে শুধুমাত্র মা আর সন্তানের সম্পর্কটাই যে শাশ্বত। তার যে কোন অদলবদল হয় না।  




4 comments:

  1. হাহাকার কবে থামবে?

    ReplyDelete
  2. পম্পা চক্রবর্তী23 July 2021 at 19:34

    সন্তানের জন্য মাতৃহৃদ‌‌য়ের চিরন্তন ব্যাকুল অপেক্ষার কথা পড়ে মন ব্যথায় ভরে গেল। সত্যিই এই সম্পর্কের কোনও অদলবদল ‌হয়না।

    ReplyDelete
  3. Din tar moton lekhatao mon kemon kora....ar kichhui bolte parlam na...mon ta bhaari hoye elo..

    ReplyDelete
  4. Lekhatar aprotyashito obhighat bakruddho kore dey....bidhatar ki nisthur porihas...

    ReplyDelete

বদল

                বছরখানেক আগে ইমন  কথা দিয়েছিল বিলাবলকে তার সাথে কখনো পলাশ দেখতে যাবে। সারাবছরের ঘোড়দৌড়ের মধ্যেও সে কথা ভোলেনি ই...