কদিন ধরে সাবিনাকে বোধহয় একটু বেশিই নজর করছে বুলি। বড় সুন্দর গায়ের রঙ সাবিনার । কাঁচা হলুদের মত। তার উপর সরু সরু কালো রঙের আঁচড়। যেন খুব সরু তুলি দিয়ে দেওয়া শিল্পীর নিখুঁত টান। বুলি খুব মন দিয়ে দেখার চেষ্টা করে সাবিনাকে। খুব চঞ্চল স্বভাব তার। গলার আওয়াজটাও ভীষণ মধুর। মাথাটা আকাশের দিকে তুলে সুরেলা গলায় যখন গান ধরে, বুলি তাকিয়ে থাকে সাবিনার চোখের দিকে। কি দৃপ্ত, গভীর চোখ। যেন অনেক কিছু বলতে চায়। বুলি মনে মনে ভাবে সাবিনার সাথে বন্ধুত্ব হলে বেশ হত।
সেদিন আকাশটা কেমন ঘোলাটে। উপর থেকে বুলি দেখছিল সাবিনার রঙের বাহার। যেন সদ্যফোটা সূর্য্যমুখী। সোনার বরণ শরীরটাতে চিরবসন্তের আবেশ। আলতো সুরে গান ধরেছে সাবিনা। সুরের ভাঁজে মাথা উপরে তুলতেই দুজনের চোখাচোখি। বিস্ময়, জিজ্ঞাসা কৌতুহল সব মিলিয়ে একদৃষ্টে বুলি তাকিয়ে আছে সাবিনার দিকে। সাবিনা উদাত্ত কন্ঠে গান গেয়ে চলেছে, আকাশে বাতাসে ছড়িয়েছে সুরের রামধনু।
মন্ত্রমুগ্ধের মত সাবিনার গান শুনতে শুনতে আর আপন করে তাকে পাওয়ার স্বপ্ন দেখতে দেখতে গোটা দুই বসন্ত পার করে দিল বুলি। বুলির মনের অলিতে গলিতে সাবিনার আনাগোনা। সাবিনা সকলের থেকে একটু আলাদা। কার কি হল, কার হল না, কার কি চাওয়া, কার কিসে অসন্তোষ এসব কোন কিছুতেই কোন আগ্রহ নেই তার। নিরাসক্ত সাবিনার এই উদাসীনতাই চুম্বকের মত আকর্ষণ করে বুলিকে। বুলির স্বপ্নের রাজপ্রাসাদে সাবিনার রাজকীয় অবস্থান। সাবিনা তার বিন্দুবিসর্গও জানেনা। জানার কোন প্রয়োজনও মনে করে না। সারা দিন নিজের কাজ সেরে দিনান্তে নিজের ছোট্ট বাসায় ফিরে যাওয়া আর সময়ে সময়ে চারিদিক মাতিয়ে দেওয়া সুরের মৌতাত, এই হল সাবিনার রোজনামচা।
সবুজের রঙ্গমঞ্চে বুলি একটু বেমানান। চোখে পড়ার মত গায়ের রঙ নয় তার, গলায় নেই মাতিয়ে দেওয়ার মত সুরের ঝংকার। চোখের চাউনিতে নেই কোন মাদকতা, চলনবলনে নজর কাড়ার মত বিশেষ কিছুই নেই। নামের সাথে সঙ্গতি রেখে বুলির ভাবগতিক কিছুটা সিপাই এর মতই। তবে আপাত কঠিন হলেও বুলির একটা সুন্দর মন আছে। যে মন স্বপ্ন দেখতে জানে। সুন্দর একটা পৃথিবীর স্বপ্ন। যে পৃথিবীতে আছে বিশ্বাস, নির্ভরতা, আর নি:স্বার্থ ভালোবাসা। কিন্তু বুলির সেই স্বপ্নালু মন বোঝার মত বন্ধু যে তার নেই! সাবিনাকে দেখার পর থেকে এমন এক বন্ধু পাওয়ার ইচ্ছেটা খুব বেড়ে গিয়েছে বুলির।
কোন এক অলৌকিক সংযোগে বুলি আর সাবিনার একটা সম্পর্ক হয়েই গেল। সারাদিন সুরের হিল্লোল তোলা গানের রাণী সাবিনা হঠাৎ একদিন আবিস্কার করল, বুলির গলাতেও সুর আছে। একটু অন্যরকম বটে তবে শুনে কানে আঙুল দিতে হয় না। গানে গানে এক প্রাণের বাঁধনে জড়িয়ে গেল দুজনে। ভালোবাসার টানে দুজনে করে বসল আমরণ সঙ্গলাভের অঙ্গীকার।
খেয়ে মেখে বেঁচে থাকার তাগিদে সারাদিন সবুজাঙ্গনের এক প্রান্ত থেকে আর এক প্রান্তে ঘুরে বেড়ায় দুজনে। দিনান্তে বাসায় ফেরার আগে কোনদিন একবার চোখের দেখা হয় কখনো বা তাও হয় না। সিপাই প্রকৃতির হওয়ার জন্য সবুজাঙ্গনে বুলির বেশ খানিকটা প্রভাব আছে। সেখানকার নিয়মবিধি তৈরী থেকে তার ঠিকঠাক পরিচালনার ভার অনেকটাই বুলির হাতে। ছোট্ট বুলির এই কঠোর অনুশাসনে অনেকেই তাকে মুরুব্বি ঠাওরায়। নিয়মের বেড়াজালে জড়িয়ে হাঁপিয়ে ওঠা কেষ্ট বিষ্টুরা মুখে কিছু বলতে না পারলেও সবসময়েই খড়্গহস্ত। পারলে এক ঝটকায় টেনে ছিঁড়ে ফেলে বুলির ঝুঁটি, মটকে দেয় বুলির বেঁটেখাটো গলাটা। আঁটোসাঁটো এই ব্যবস্থা সাবিনারও যে খুব পছন্দ তা নয় কিন্তু সে তেমন ঘাড় মটকানো প্রকৃতিরই নয়।
সাবিনার এই সাধুভাব একটু বোধহয় অসুবিধাতেই ফেলে দেয় গুরু গম্ভীর কেষ্টবিষ্টুদের। তার সাবলীলতা, দু'চোখের দৃপ্ত ভাষা, সাদাকে সাদা আর কালোকে কালো বলতে পারার মত বলিষ্ঠ মেরুদন্ড কিছুতেই গ্রহণযোগ্য হয় না গুরুঠাকুরদের। কিছু পাওয়ার জন্য যারা হাতে হাত ধরে, তাদের বশ করতে নিছক কিছু প্রতিশ্রুতিই অব্যর্থ মহৌষধি। কিন্তু সাবিনা! তার যে কিছুই চাওয়ার নেই। তাই প্রতিশ্রুতির বিষ মাখানো তীর একটা পালকও খসাতে পারেনা তার। অনেক সুলুক সন্ধান, বাছবিচার করে দাদাভাইরা সিদ্ধান্ত নিলেন সাবিনাকে জব্দ করার একমাত্র উপায় ওর আত্মসম্মানের দুর্ভেদ্য দেওয়ালটা চুরমার করে দেওয়া। কারো পাকা ধানে মই না দিয়েও সাবিনা কেন যে এই আক্রোশের শিকার হল, তার ব্যাখ্যা কারো কাছে নেই। হয়তো বা বুলির সাথে সাবিনার সম্পর্কের অন্যরকম ধরণটাই তার একমাত্র কারণ। নিজেকে মেলে ধরার জন্য বুলি একটা সুরক্ষিত আশ্রয় পাবে এটা দাদাঠাকুরদের পক্ষে কিছুতেই মেনে নেওয়া সম্ভব নয়।
সকাল থেকে সেদিন অবিরাম বৃষ্টি পড়ে চলেছে। কারো কোথাও নড়বার উপায় নেই। বুলি আর সাবিনার একটু পাশাপাশি বসার সুযোগ এসে গেল। দুই প্রাণসখা কাছাকাছি বসে থাকলেও সাবিনা কেমন যেন নিজের মধ্যে নেই।
"কি হয়েছে তোমার! মুখ এমন ভার কেন? গলায় আজ মিষ্টি সুরেরও দেখা নেই!"
সমস্ত আবেগ উজাড় করে সাবিনাকে জিজ্ঞাসা করে বুলি।
সাবিনা খুব নরম গলায় উত্তর দেয় - "এরকমটা বোধহয় না হলেই ভাল হত"।
কি হয়েছে, কি না হলেই ভাল হত এসব জানতে চাওয়ার হাজার চেষ্টা করেও বুলি সত্যানুসন্ধান করতে পারল না। সাবিনার স্বভাবই এরকম। কারো কাছে অভিযোগ করতে সে জানেনা। তা সে বুলিই হোক বা আরও অনেক কাছের অন্য কোন জন।
কিছুদিন যাবৎ সবুজাঙ্গনে কেমন একটা থমথমে ভাব। সাবিনা আচমকা কেমন যেন বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে সকলের কাছ থেকে। গাছে তুলে মই কেড়ে নিয়ে পাশ থেকে সরে যাওয়া দাদাঠাকুররা কিছুটা বাতিলের দলে ফেলে দিয়েছে সাবিনাকে। অনেকটা বিনা কারণেই। অপমানে, অভিমানে ক্ষতবিক্ষত সাবিনার বুক ফাটে তবু মুখ ফোটে না।
সেদিন পড়ন্ত বিকেলে বুলির পাশে দুদন্ড বসল সাবিনা। শত চেষ্টা করেও বুলির কাছে নিজের দোলাচল লুকিয়ে রাখতে পারল না সে। আচমকা প্রায় শেষ সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিল বুলিকে-
" সবুজাঙ্গনে আমি আর থাকব না"
বুলির বুকের ভিতরের সমস্ত কলকব্জা এক লহমায় স্থির হয়ে গেল।
"মানে! আমাকে ছেড়ে তুমি চলে যাবে! আমাকে ফেলে দিয়ে যাবে নি:সঙ্গতার কালকুঠরিতে! না না এমন কোর না ।"
কাকুতি মিনতি করে বুলি জানতে চায় সাবিনার এই কঠিন সিদ্ধান্তের কারণ।
চোখের কোণে জলের ফোঁটা অতি কষ্টে সামলে রেখে সাবিনা বলে - "তোমাকেও বলতে হবে! তুমিও বুঝবে না!"
এই কঠিন সত্যের মুখে দাঁড়িয়ে মাথা নীচু হয়ে গেল বুলির। সত্যিই তো নিজের ভালোবাসার জনের মনের কথা যদি বুঝতেই না পারা গেল তাহলে সে ভালোবাসার সার্থকতা কোথায়!
কয়েকদিনের মধ্যে সবুজাঙ্গনে ঘটে যাওয়া সমস্ত ঘটনা গুলো একের পর এক সাজাতে সাজাতে বুলি খুঁজে পায় তার প্রশ্নের উত্তর। বুঝতে পারে এই কদিনে কি প্রচন্ড ঝড় বয়ে গেছে সাবিনার মনের উপর দিয়ে। সবুজাঙ্গনের তথাকথিত মাতব্বররা কি নির্মম ভাবে ক্ষতবিক্ষত করেছে সাবিনার ফুলের মত নরম সংবেদনশীল মনটাকে। আর সাবিনা একা বয়ে বেড়িয়েছে এই দু:সহ ক্ষতের যন্ত্রণা। জানতেও পারেনি বুলি।
নিজের উপর খুব রাগ হয় বুলির। কেমন বন্ধু সে! বন্ধুর বুকে লুকিয়ে থাকা গভীর আঘাতে এতটুকু প্রলেপ লাগাতে পারে না! প্রতিজ্ঞা করে, সাবিনার এই অপমানের যোগ্য জবাব সে দেবে। যেমন করেই হোক নিজের ভালোবাসার জনকে দুর্বিষহ, দম বন্ধ করা অসম্মানের খাঁচা থেকে মুক্ত করবে সে। বন্ধুর প্রশ্বাসবায়ুতে মিশিয়ে দেবে ভালোবাসার আবেশে ফোটা হাস্নহানার গন্ধ। মাখনের ছুরির মত মধুর কথায় অন্যকে বিঁধে ফেলার অদ্ভুত ক্ষমতা আছে বুলির। এই অসম যুদ্ধে সেই ক্ষমতাকেই প্রধান অস্ত্র হিসেবে বেছে নিল সে।
সুরের ইন্দ্রমহলে সাবিনা অন্যতম ঊজ্জ্বল নক্ষত্র। নিজের সেই জ্যোতি গোটা নন্দনভূমিতে ছড়িয়ে দেওয়ার স্বপ্ন দেখেছিল সাবিনা। আকাশপ্রদীপের সেই জ্যোতি নিভিয়ে দেওয়ার জন্য ফাঁদ পেতেছিল সবুজাঙ্গনের মেনকা আর তার সঙ্গীরা যারা নিজেদের সবুজাঙ্গনের হর্তাকর্তা বিধাতা বলে ভাবতে অভ্যস্ত। সাবিনার ছোট্ট স্বপ্নকে সত্যি করে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে প্রস্তুতিহীন এক যুদ্ধের সামনের সারিতে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল তাকে। সীমান্তে দাঁড়িয়ে থাকা নিরস্ত্র সৈনিকের মত। বুলির ধর্মযুদ্ধে মেনকাই হল প্রথম বন্দি সেনা। বুলির ঝুঁটির ঝাপটা, নখের আঁচড় আর মধুর বক্রবচনের একের পর এক তীক্ষ্ণ আঘাতে প্রাণের দায়ে রণে ভঙ্গ দেয় মেনকা। সঙ্গে নিয়ে যায় তার পরম বশংবদ কমললতাকে। বুলির কথা তাদের পছন্দ না হলেও বুলির যুক্তির ধারালো তলোয়ার ফালা ফালা করে দিয়েছে বর্মের আড়ালে থাকা মেনকা আর কমললতার অহংকারী বিবেককে। শুধু এটুকুই নয় আরো অনেক অব্যর্থ অস্ত্র আছে বুলির আস্তিনে। সে সব অস্ত্রে একে একে শান দিতে থাকে বুলি। গুরুঠাকুরদের এক এক করে ঘায়েল করতে হবে তাকে। অত্যন্ত পরাক্রমশালী কেশরীমোহন, নৃপতিকুমার, সূর্য্যনন্দন, তথাগত আরও আরও কত ছোটবড় জানা অজানা নারায়ণী সেনা নিয়ে তৈরী বাহুবলী গুরুঠাকুরের দল। বুলির সম্বল শুধু তার ধারাল যুক্তি আর উপস্থিত বুদ্ধি। কিন্তু বুলি সকলের চেয়ে অনেক শক্তিধর। সাবিনার ভালোবাসার অনন্ত মহাকাশ তার বিচরণক্ষেত্র। চুড়ান্ত অসম এক লড়াই চালিয়ে যায় বুলি। মর্যাদা রক্ষার লড়াই। নিজের ভালোবাসাকে জয়ী করার লড়াই। বুলির ছোট্ট হৃদয়ের অতলান্তিক ভালোবাসাকে প্রতিষ্ঠা করার লড়াই। হার না মানার লড়াই।
সাজগোজ করতে করতে মুখোমুখি লড়াইটা লড়েই ফেলল বুলি। এক হ্যাঁচকা টানে ছিঁড়ে ফেলল সবুজাঙ্গনের সমস্ত গুরুঠাকুর আর তাদের দলদাসদের মুখোশ। কয়েকদিনের নিরন্তর লড়াই বুলিকে দাঁড় করিয়ে দিল এক নির্মম সত্যের মুখোমুখি - সবুজাঙ্গনে বুলি একদম একা। তার চারপাশে একটাই দল যার নাম "বিরোধী"। কেউ বিরোধিতার উদ্দেশ্যে বিরোধী কেউ আবার ক্ষমতা হারানোর ভয়ে। হাজার কঠিন হলেও এ লড়াই বুলিকে জিততেই হবে। তাতে যদি ছোট্ট শরীরটা ক্ষতবিক্ষত হয়ে যায় কিংবা নিভেই যায় জীবনের আলো, তাতেও ক্ষতি নেই। তবু সাবিনাকে সে বোঝাবেই তার ভালোবাসার গভীরতা।
ডালপালার আড়াল থেকে শুরু হওয়া ঠান্ডা লড়াই ধীরে ধীরে তর্কযুদ্ধের গলিপথ পার হয়ে পৌঁছল তীব্র মানসিক যুদ্ধের প্রশস্ত রাজপথে। বুলির উপর চলতে লাগল অসহনীয় মানসিক অত্যাচার। সবুজাঙ্গনের সমস্ত বাতাসে বারুদের গন্ধ। একের পর এক বিস্ফোরণ ধ্বংস করে দিল নন্দনভূমির নিস্তব্ধতা। শত্রুপক্ষের প্রবল বাহুবল আর মানসিক নির্যাতনের সাঁড়াশি আক্রমণে বুলি বন্দি হল চক্রব্যুহে। শুধুমাত্র অকাট্য যুক্তি আর অদম্য মনোবলকে সম্বল করে বধ্যভূমিতে পা রেখেছে সে। সামনে রয়েছে তার হৃদয় উজাড় করা ভালোবাসার ঢাল। সমস্ত অস্ত্রের আঘাত সেই ঢাল দিয়ে ঠেকাতে ঠেকাতে চক্রব্যুহ ভেদ করল বুলি।
সবুজাঙ্গনে এল নতুন ভোর। ভোরের শুরুতেই আকাশ বাতাস জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে সাবিনার সুরের সৌরভ। বুলির দুই কানে বাজছে আনন্দভৈরবী। সবুজাঙ্গনের মুক্ত প্রাঙ্গনে সাবিনার এখন অবাধ গতি। প্রত্যেকের চোখে সাবিনার প্রতি সম্ভ্রমের দৃষ্টি। বিজয় নিশ্চিত জেনেও শুধুমাত্র সবুজাঙ্গনকে কলুষমুক্ত রাখতে কারো সাথে কোন সংঘাতে যায়নি সাবিনা। তার এই কঠিন সিদ্ধান্ত তার প্রতি অনেকের শ্রদ্ধা বাড়িয়ে দিয়েছে কয়েক গুণ। অবলীলায় ক্ষমতার হাতছানি এড়িয়ে সাবিনা প্রতিষ্ঠা করেছে তার মূল্যবোধের শক্ত বুনিয়াদ। সকলের কাছ থেকে পাওয়া সাবিনার এই সম্মান অনেক উঁচুতে তুলে ধরেছে বুলির ধর্মযুদ্ধের বিজয় পতাকা। দুজনের ভালোবাসা সবুজাঙ্গনের প্রতিটি কোণায় ছড়িয়ে দিয়েছে যুদ্ধবিরতির উদাত্ত ঘোষণা।
বেশ কয়েকদিন পর আজ আকাশে কনে দেখা আলো। পশ্চিমের আকাশটায় আগুনপাখি মেলে ধরেছে তার চওড়া ডানা দুটো। বাসায় ফেরার আগে আজ সাবিনার মন বড় চঞ্চল। রণক্লান্ত বুলিকে এক ঝলক দেখার জন্য আকুল। শ্লথ গতিতে সাবিনার খুব কাছে এসে বসল বুলি। সাবিনার ইচ্ছে করে নিবিড় আলিঙ্গনের আবেশে বুলিকে জিজ্ঞেস করে- "তুমি কি খুব ক্লান্ত"!
পরম যত্নে বুলির দিকে তাকায় সাবিনা।
"একি! তোমার অমন রংবাহারি ঝুঁটি! কোথায় গেল সে!"
ক্ষীণ স্বরে বুলি উত্তর করে- "এক কোপে কেটে দিয়েছে কেশরীমোহন।"
"তোমার ডানায় এত গভীর ক্ষত! কেমন করে হল এসব?"
"এসব সবুজাঙ্গনের পুরস্কার। আগ্রাসী, ক্ষমতালোভীদের মুখোশ ছিঁড়ে ফেলতে পারার সাফল্যের স্বীকৃতি। তোমার মনের কথা বুঝতে না পারার প্রায়শ্চিত্ত"।
বুলির দু'চোখের কোণ দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে সরু জলের ধারা। ঠোঁটের দুই কোণে শুকিয়ে যাওয়া রক্তের দাগ। ক্ষতবিক্ষত পায়ে ভর রাখতে কষ্ট হচ্ছে তার। থরথর করে কাঁপছে সারা শরীর। অনেক চেষ্টা করে যন্ত্রণায় ছিঁড়ে যাওয়া ঘাড়টা সাবিনার দিকে ঘোরায় বুলি-
"দেখো সমস্ত নন্দনভূমি আজ তোমার গুণমুগ্ধ। তোমাকে বিন্দুমাত্র অসম্মান করার সাহস আজ আর কারও নেই। আর কোন অভিমান নেই তো তোমার!"
সাবিনার কন্ঠের সমস্ত সুর এক নিমেষে কে যেন চুরি করে নিয়ে গেল।
"এ তুমি কি করলে! নিজেকে এমন করে তালগোল পাকিয়ে দিলে কেন! তোমার আঘাতের বিনিময়ে পাওয়া এই সম্মানের কোন মূল্য নেই আমার কাছে। আমি তো শুধু তোমাকে নিয়েই সুখী থাকতে চাই। আর কিচ্ছু চাই না আমার। জোর করে ছিনিয়ে আনা এই সম্মান ক্ষণস্থায়ী। সবুজাঙ্গনের এই খোলা হাওয়ায় আমায় ভেসে বেড়াতে দাও। কিচ্ছুতে জড়িও না আমায়। আমি ছুটি চাই বন্ধু, ছুটি দাও আমায়"।
ক্লান্তিতে প্রায় বুঁজে আসা চোখ দুটো জোর করে খুলে সাবিনার দিকে তাকায় বুলি। "বন্ধুই যদি হলাম তবে ছুটি নিতে চাও কেন? এখনো যে আমার লড়াই অনেক বাকি। প্রাণের স্পন্দন যেটুকু অবশিষ্ট আছে তা দিয়ে তোমায় সাথে করে লড়তে চাই। বন্ধু ফেলে যেও না আমায়।"
এবার আর সাবিনা নিজেকে সামলাতে পারে না। এক ঝটকায় কাছে টেনে নেয় বুলিকে। ভরিয়ে দেয় চুম্বনে চুম্বনে। আদরে, আশ্লেষে নিবিড় থেকে আরও নিবিড় আলিঙ্গনে আবদ্ধ হয় ওরা।
"তোমায় ছেড়ে আর কোথাও তো যাবার উপায় আমার নেই। কিন্তু বন্ধু আমার যে বড় ভয় করে! সবুজাঙ্গনের এই বারুদের স্তুপ যদি ঘটায় তীব্র সর্বনাশা বিস্ফোরণ! আচমকা ছুটে আসা জলোচ্ছাসে যদি তলিয়ে যায় গোটা নন্দনভূমি! আমরা কোথায় দাঁড়াব বন্ধু"!
সাবিনার আদরের কোমল স্পর্শে কর্পূরের মত উবে গিয়েছে বুলির সমস্ত যন্ত্রণা। নিজের ভালোবাসার আয়নায় নিজেকে মনে হচ্ছে এক বিজয়ী সেনাপতি। সাবিনার উষ্ণ আলিঙ্গনে শান্ত হয়ে গিয়েছে বুলির কাঁপতে থাকা ক্ষতবিক্ষত শরীরটা। গলার আওয়াজ কিছুটা হলেও ফিরে পেয়েছে আপন মাধুরী। সাবিনার চোখের উপর চোখ রেখেছে বুলি। গালের উপর গাল। অন্তরঙ্গ আদরে মধুমাখা স্বরে বুলি উজাড় করে দিল নিজের হৃদয়ের সমস্ত আবেগ- "বন্ধু, হোক না সর্বনাশ, আসুক জলোচ্ছাস। একসাথে ভাসতে যদি না হয় পারলামই না, চলো না একসাথেই ডুবি!"
বুলি ও সাবিনার প্রেম সবুজাঙ্গনের মতোই চিরসবুজ চিরনবীন চিরতরুণ থাকুক।আধিপত্যবাদী স্বৈরশক্তি কেশরীমোহন নৃপতিকুমার তথাগতদের ভালোমানুষির মুখোশ শেষ অবধি ছিঁড়ে গেল।
ReplyDeleteপ্রতিদিনের যাপনে আমরা এই লালছসর্বস্ব ক্ষমতালোভীদের সমাজের সর্বত্র দেখতে পাই। লেখকের কল্পনা পরিকল্পনা ও শক্তিমান কলমের জয় হোক।
সমাজের চিত্রায়ন নিখুঁত লেখার তুলি তে ফুটে উঠেছে।
ReplyDeleteখুব বলিষ্ঠ লেখা। সমাজের প্রতিফলন হয়েছে খুব সুন্দর।
ReplyDeleteOpurbo...!
ReplyDeleteBastob borho kothin...tobuo beNche thak Buli ar Sabina ra evabei..
Likhte thakun, opekhyay roilam.
(Shampa)
Bondhutto jibon er anayatama ekta samparka... Tar assawad je peyeche, sei jaane tar gurartha...
ReplyDeleteকাল্পনিক চরিত্রের আড়ালে সমাজের কঠিন বাস্তবতার সার্থক রূপায়ণ। বুলি ও সাবিনার বন্ধুত্ব চিরস্থায়ী হোক। অসাধারণ রূপক ধর্মী এক লেখা, অনেক ধন্যবাদ। ������
ReplyDeleteঅসাধারণ। রূপককে ব্যবহার করে দুজন নারীর কথা।
ReplyDeleteপ্রতিদিনের সামাজিক জীবনযাত্রায় মানুষের কল্পলোকের নন্দনভূমির সবুজাঙ্গন এভাবেই প্রায়শঃ তছনছ হয়ে যায়। দুঃসময়ের অসম লড়াইয়ে একমাত্র স্বার্থহীন বন্ধুত্বই হয়তো পারে স্রোতের বিপরীতে বাইবার সাহস ও শক্তি দিতে।
ReplyDeleteরূপকাশ্রয়ী এই লেখা পড়ে লেখকের লেখনীশক্তির প্রতি আস্থা বহুগুন বিবর্ধিত হলো।
বুলি সাবিনার বন্ধুত্বের গভীরতাকে পাঠকের কাছে এত সুন্দর ভাবে ফুটিয়ে তোলার জন্য অসাধারণ কিছু কথা এখানে দেখতে পেলাম । লেখার মধ্যে কল্পনা যতই থাকুক , বাস্তব ক্ষেত্রে এটি একটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক, শিক্ষণীয়, সুরুচীসম্পন্ন, মধুর, নিঃস্বার্থ, ভালোবাসার কথামালা । অভিনন্দন ও অশেষ ধন্যবাদ জানাই ।
ReplyDeleteআবহমান কাল থেকে চলে আসা সমাজ নামক এক প্রতিষ্ঠানের স্বৈরাচারী অনুশাসনের বিরুদ্ধে সাবিনা আর বুলির পারস্পরিক ভালোবাসার বিজয় কেতন চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। লেখনীর দৃঢ়তাকে কুর্নিশ জানাই।
ReplyDeleteরুপক ব্যবহার করেছেন চমৎকার ভাবে। চিরাচরিত বাস্তব ফুটে উঠেছে লেখাতে। দুর্দান্ত লাগল।
ReplyDeleteEkdom notun dhoroner kahini eti, otyachar ar agrashoner biruddhe bondhutto, bhalobasha r je Joy, ei rupokdhormi golpo ti tar i nidorshon, ajker juddhobiddhosto prethibir kache ei bhalobasha r bani aj otyaboshook bole mone hoy.
ReplyDelete