About Me

My photo
Kolkata, West Bengal, India

Wednesday, 19 May 2021

শেষ কোথায়

                            সেদিন ছবির ঝাঁপি ঘাঁটতে ঘাঁটতে অনেক পুরনো ছবি খুঁজে পেলাম। জীবনের বিভিন্ন সময়ে কত সুন্দর  সব অভিজ্ঞতার আস্বাদ পেয়েছি। আজ যেন সে সব কল্পনারও অতীত। অনেক লড়াইয়ের পর অধ্যাপনা করার সুযোগ যদিও বা মিলল, তাতে শুরু  হল নতুন এক লড়াই। নিত্য যাত্রার লড়াই। মাঝ রাতে ঘুম থেকে উঠে চাকরি করতে যাওয়া, তাও কলকাতা থেকে বেশ অনেকটা দূরে। প্রথম কিছুদিন কষ্ট হলেও পরে এই নিত্যযাত্রা ক্রমশঃ বড় আনন্দের হয়ে উঠল। বড় মধুর ছিল আমাদের সেই চাকরি জীবন। সহকর্মীরা কেউ বয়সে বড় হলেও পরম বন্ধু, কেউ অভিভাবক কেউ বা সহমর্মী। সব টা মিলিয়ে একঝাঁক মানুষ, যাদের সঙ্গ  ছিল উপভোগ করার মত। তার মধ্যে আবার কয়েকজন ছিল যাদের মুক্তি ছিল আকাশে। এদের নিয়ে এক ছোট্ট দল ছিল আমাদের, কোথাও যাদের হারিয়ে যাওয়ার মানা ছিল না। 

                         সেবার অধ্যাপকদের রাজ্যসম্মেলনে গেছিলাম বালুরঘাট। সম্মেলনের অছিলায় নিছক বেড়াতে যাওয়া।  বালুরঘাট থেকে  ইন্দো বাংলাদেশ সীমান্তের হিলি তে। বড় অদ্ভুত এ জায়গায় সীমান্তের বন্টন। হিলি স্টেশনের প্লাটফর্ম পড়ে ভারতে তো রেললাইন বাংলাদেশ। বেশ সুন্দর গ্রাম্য পরিবেশ। আমরা যখন স্টেশনের কাছে পৌঁছলাম তার কিছুক্ষণের মধ্যেই একটা ট্রেন আসবে , বাংলাদেশের ট্রেন। রেললাইনের দুই পাশে দুই দেশ। অসংখ্য মানুষ দাঁড়িয়ে আছে লাইনের দু ধারে। আমরা কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছিলাম না যে ট্রেনে যারা চড়বে তারা প্ল্যাটফর্মে না দাঁড়িয়ে লাইনের পাশে কেন দাঁড়িয়ে আছে! এরপর আকাশ কাঁপানো আওয়াজ করে আসতে লাগল বাংলাদেশের ট্রেন। দূর থেকে ট্রেন আসছে দেখেই হাজার হাজার মানুষ নেমে পড়ল রেললাইনে। চলন্ত ট্রেনের একেবারে সমনে দিয়ে জীবন হাতে করে মানুষ গুলো পৌঁছে গেল একদেশ থেকে আর এক দেশে। সে দৃশ্য দেখে গায়ে যেন কাঁটা দিয়ে উঠেছিল। রেললাইনের দুধারে দুদেশের সীমান্ত রক্ষী বাহিনী নিরূপায় হয়ে দেখতে লাগল মানুষের এই দেশবদল। ট্রেন চলে যাওয়ার পরে যেন যুদ্ধ শেষের নীরবতা। কিছু মানুষের সাথে কথা বলে জানতে পারলাম এই পারাপার নাকি রোজের ঘটনা। চিনি, নুন, চাল, সুতির শাড়ি এ সমস্ত জিনিস দুদেশের মানুষের মাধ্যমে চলে যায় দেশান্তরে। অনেক সময় অনেকে পৌঁছতে না পেরে ধরা পড়ে রক্ষীদের হাতে, কেউ বা ঝাঁপ দেয় পাশের পুকুরে। প্রাণও চলে যায় কখনো বা। কিন্তু ঠিক ট্রেন ঢোকার মুহুর্তে সীমান্ত রক্ষীর চোখ এড়িয়ে পার হতে না পারলে আর পার হওয়ার কোন উপায় নেই মানুষের। বড় অদ্ভুত লেগেছিল ভেবে বছরের পর বছর মানুষ এভাবে কি করে বেঁচে আছে!। কয়েকজন মহিলা কে দেখলাম অনেকগুলো শাড়ি পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে পরে দাঁড়িয়ে আছেন ট্রেন আসার আপেক্ষায়। এভাবেই তাদের সাথে দেশান্তরে যায় সুতির শাড়ি। নিজের চোখে না দেখলে কোনদিন বিশ্বাস করতে পারতাম না।   এভাবেই পারাপারের জীবন কাটায় এই গ্রামের মানুষগুলো। ট্রেন চলে যাওয়ার পর আমরা বেশ কিছুক্ষণ সময় কাটালাম গ্রামের বাচ্ছা গুলোর সঙ্গে। দেখা মিলল দুই সহোদর ভাইয়ের  - একজন রাম আর একজন কবীর। 

                        আজ মনে হয় দিন গুলো যেন স্বপ্ন ছিল। মাথার উপর ছাতার মত থাকা সেই সহযাত্রীরা আজ যে যার বৃত্তে আবদ্ধ। আজও হয়তো সেই ট্রেন আসে, মানুষজন পারাপার করে, কিন্তু রাম আর কবীরের কথা জানতে আর কেউ যায় কি! অজানা অচেনা সীমান্তে নির্ভয়ে হারিয়ে যাওয়ার মন নিয়ে মুক্তির নেশায় ছুটে যায় কি কেউ ? আজও! নির্দ্বিধায় ভরসা করার সেই কাছের মানুষ গুলো আজ যেন কত দূরে। মহামারীর রাক্ষুসে চোখ সবাইকে যেন ছুঁড়ে ফেলেছে ভিন্ন ভিন্ন গ্রহে। পৃথিবীর চেনা ছবিটার সব রঙ ছিনিয়ে নিয়ে ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে সম্পর্কের সব বন্ধন। অনিশ্চয়তার পথে চলতে চলতে, প্রিয় জনকে হারাতে হারাতে একটাই প্রশ্ন মোচড় দিয়ে ওঠে - পথের শেষ কোথায়!



5 comments:

  1. পম্পা চক্রবর্তী20 May 2021 at 02:11

    শেষ নাহি যে,‌ শেষ কথা কে বলবে।
    ফুরায় যা, তা
    ফুরায় শুধু চোখে--
    অন্ধকারের পেরিয়ে দুয়ার
    যায় চলে আলোকে।
    .......... সেই আলোর আশাতেই বুক বেঁধে থাকতে হবে।
    বড় মন ছোঁয়া স্মৃতি কথন।

    ReplyDelete
  2. এই পরিস্থিতিতে এমন লেখা মনকে ছুঁয়ে যায় ...হৃদয় ভারাক্রান্ত হয়ে গেল ঠিকই ... কিন্তু সময় তো থেমে থাকে না..! আরো লেখার অপেক্ষায় রইলাম...🙏

    শম্পা

    ReplyDelete
  3. Ei anubhuti jaowar noy...thakuk sara jibon sangi hoye ... amlo-modhur smriti hoye..

    ReplyDelete
  4. Erokom kore line par kore ? Bhaba jai na....Ekhon to train o nei....Ki odbhut jibon dharoner pontha..Manush koto osohai....Apnar smriti charoney janlam.....MAUMITA

    ReplyDelete
  5. Manush i paare, asadhya sadhana korte. Apni taar ekta nidharshan amader sathe share korechen, apni apnar jibon e anek kichu experience korechen, sadhu sadhu.

    ReplyDelete

বদল

                বছরখানেক আগে ইমন  কথা দিয়েছিল বিলাবলকে তার সাথে কখনো পলাশ দেখতে যাবে। সারাবছরের ঘোড়দৌড়ের মধ্যেও সে কথা ভোলেনি ই...