ছোট থেকে বড় হতে হতে অনেক কিছুই পাল্টে গেল। সবচেয়ে বেশি করে বোধহয় পাল্টে গেলাম আমরা। যে নিবিড় পারিবারিক নির্ভরতা আর নিখাদ স্নেহ ভালোবাসা দিয়ে আমাদের ছোটবেলা কেটেছে, কোথাও গিয়ে যেন সব তালগোল পাকিয়ে গেল। আজ পিছন ফিরে তাকালে স্মৃতির সমুদ্র থেকে উঠে আসে অমূল্য সব সম্পদ, আমাদের জীবনীশক্তির পরশপাথর। এমনই এক সম্পদ আমার বড় মাইমা। জীবনে কোনদিন তাঁকে মাইমা বলে ডাকিনি। মা যেহেতু বৌদি ডাকেন, তাই মাইমা চিরকাল আমারও বৌদি। শুধু ডাকে নয় বৌদিকে বোধহয় কোন কিছুতেই কখনও মায়ের থেকে আলাদা করা যায় নি। মায়ের কাছে গল্প শুনেছি আমার শৈশবের কঠিন অসুখ থেকে সমস্ত রকম বায়না বা আবদার পরম বাৎসল্যের সঙ্গে সামাল দিত বৌদি। মা চোখ বড় করে তাকালে শাড়ীর খুঁট ধরে বৌদির আড়াল ছিল সবচেয়ে নিশ্চিন্ত আশ্রয়।
প্রত্যন্ত গ্রামে মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম হয়েছিল বৌদির। লেখাপড়ার সুযোগ ঠিকমত পেয়ে ওঠার আগেই আমার মামার বাড়ির বিশাল যৌথ পরিবারের বড় বউ হয়ে চলে আসে পাকুড়তলার বিভারাণী। শুরু হয় সংসার সংগ্রাম। দেওর ননদের ভরপুর সংসারে বৌদির ভূমিকা, শরৎবাবুর উপন্যাসের বড় বউ এর থেকে আলাদা কিছু ছিল না। নম্বর ধরে ধরে দেওরদের সম্বোধন করত বৌদি। মেজ, সেজ, ন, ছোট। উচ্চারণে উহ্য থাকলেও দেওর রা বৌদির আপন ভাই এর চেয়ে কম কিছু ছিল না। দেওর ননদের পাছে কষ্ট হয় তাই নিজের বাপের বাড়ির কথা একপ্রকার ভুলেই গিয়েছিল বৌদি। ধীরে ধীরে সমস্ত পরিবারটা সযত্নে নিজের হাতে গুছিয়ে তুলে ক্রমশঃ বৌদি থেকে কখন যেন পরিবারের মা হয়ে গেল বিভারাণী।
আমার ছোটবেলা কেটেছে বৌদির শাসন আর স্নেহের এক অদ্ভুত মিশেলের মধ্যে দিয়ে। কোন একটা অন্যায় করে ছুট্টে পালালে পিছন পিছন মিলিটারি মেজাজে ছুটে আসত বৌদি। হাতে গরম খুন্তি আর মুখে একটা অদ্ভুত শব্দ করে বলত - হারামজাদী। এ শব্দের মানে তখন বুঝতাম না। আজ বুঝি এটা বকুনি নয় নিছক আহ্লাদ। কি যে আনন্দের খেলা ছিল! দুধের চাঁচি থেকে মাছের আঁশ ভাজা, গোল গোল বেগুন ভাজা থেকে মুচমুচে তালের বড়া, আমের মিষ্টি আচার থেকে বড় বড় রসবড়া, যত বায়না সব বৌদির কাছে। গরমের দুপুরে নিয়ম করে লোডশেডিং আর বৌদির হাতের তালপাতার পাখা যেন একে অপরের পরিপূরক। এক মিনিটের জন্যও থামত না সে পাখা। পাছে আমার ঘাম হয়ে সর্দি লাগে। বৌদির ছেলে, মেয়ে আর আমি এই ছিল আমাদের পিঠোপিঠি ভাইবোনের বৃত্ত। কোন একটা কারণে খুনসুটি বাঁধিয়ে ভাইকে বকুনি খাওয়ানোর মজাই ছিল আলাদা। ভাগ্নীর মনোরঞ্জনের জন্য নিজের সন্তানকে শাসন করার মত মা, আজ সত্যিই বিরল। আটপৌরে শাড়ি ছাড়া অন্য কিছু তে দেখলে বৌদিকে চিনতে একটু অসুবিধাই হত। আমার নাছোড়বান্দা স্বভাবের জন্য বৌদির পানের নেশাও কখনও প্রশ্নের মুখে পড়ে যেত। এটা খেলে ওটা হবে এরকম অনেক কিছু বলেও যখন আমাকে জর্দাপানের বায়না থেকে নিরস্ত করা যেত না, তখন চুনের বাটিতে ডুবিয়ে হাতে দিত একটা পানের বোঁটা। সে যেন বিজয় পতাকা। কিছু তো পাওয়া গেল! আমার বাড়ি আর মামার বাড়ির দুরত্ব খুব বেশি ছিল না। তাই ভালমন্দ রান্না হলে আমার ভাগের টা সঠিক সময়ে পৌঁছে দিতে বৌদির যেমন কখনও ভুল হত না, তেমনই কখনও ভুল হত না পাত্রের ঢাকার উপর এক চিমটে নুন দিতে, পাছে কারো নজর লাগে।
ছোটবেলার এই অভ্যাস বড় হয়েও বদলায় নি। জীবনের সমস্ত ওঠা পড়ায় বৌদি ছিল একান্ত নিবিড় আশ্রয়। কাজের চাপে বৌদির কাছে নিয়মিত যাওয়ার রুটিন বদলে যায়। বৌদির জীবনেও নেমে আসে নানা ঘাত প্রতিঘাত। পরিবারে ঢুকে পড়ে টুকরো হওয়ার কর্কট রোগ। উপর্যুপরী স্বজন হারানোর শোক আর সংসারে ক্রমশঃ বাতিলের দলে চলে যাওয়া বৌদি, ক্রমশঃ অশক্ত হয়ে পড়ে। আমার বাবা মা পছন্দ করতেন না বলে আমার কোন ডাক নাম নেই। কিন্তু সবাই আমাকে যেভাবে দেখে, তার থেকে বৌদির চোখে আমি ছিলাম একটু আলাদা। আমার জন্ম বৃহস্পতিবারে এ কথা সবাই জানে কিন্তু একমাত্র বৌদিই বোধহয় আমার লক্ষ্মীশ্রীর সন্ধান পেয়েছিল। আমার একটা ডাক নাম হয়েছিল - লক্ষ্মী। জীবনে কোনদিন বৌদি আমাকে আমার পোশাকী নামে ডাকে নি।
২০২০ সালের শেষ দিনে, বছরের বিষের ভার সঙ্গে নিয়ে তেমনই এক বৃহস্পতিবারে আমাদের সকলকে লক্ষ্মীছাড়া করে চলে গেল আমার মামার বাড়ির গৃহলক্ষ্মী। আমার পরম নিশ্চিন্ত আশ্রয় পৌঁছে গেল ঈশ্বরের পরম শান্তির আশ্রয়ে। আমার মা যশোদা - তুমি খুব ভালো থেকো, শান্তি তে থেকো!



Amar Pronam janai...🙏🙏🙏
ReplyDeleteShampa
Pronam janai🙏 Shantite thakun valo thakun.
ReplyDeleteপ্রনাম।
ReplyDeleteএই মানুষ গুলো ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে। আজকের প্রজন্ম এরকম আর পাবেনা, আমরা দিতে পারলামনা.....
সেই শৈশব থেকে দেখে আসা স্নেহময় মানুষগুলির ক্রমশ জীবন থেকে এভাবে হারিয়ে যাওয়া মেনে নিতে খুব কষ্ট হয়। সবচেয়ে খারাপ লাগে, তাঁদের মত কাউকে আর পাওয়া যাবে না। সত্যিই এক অপূরণীয় ক্ষতি।
ReplyDeleteJethima r por maima...Dujon er smriticharon opurbo...Onar atmar shanti kamona kori. Maumita
ReplyDelete