About Me

My photo
Kolkata, West Bengal, India

Wednesday, 19 May 2021

শেষ কোথায়

                            সেদিন ছবির ঝাঁপি ঘাঁটতে ঘাঁটতে অনেক পুরনো ছবি খুঁজে পেলাম। জীবনের বিভিন্ন সময়ে কত সুন্দর  সব অভিজ্ঞতার আস্বাদ পেয়েছি। আজ যেন সে সব কল্পনারও অতীত। অনেক লড়াইয়ের পর অধ্যাপনা করার সুযোগ যদিও বা মিলল, তাতে শুরু  হল নতুন এক লড়াই। নিত্য যাত্রার লড়াই। মাঝ রাতে ঘুম থেকে উঠে চাকরি করতে যাওয়া, তাও কলকাতা থেকে বেশ অনেকটা দূরে। প্রথম কিছুদিন কষ্ট হলেও পরে এই নিত্যযাত্রা ক্রমশঃ বড় আনন্দের হয়ে উঠল। বড় মধুর ছিল আমাদের সেই চাকরি জীবন। সহকর্মীরা কেউ বয়সে বড় হলেও পরম বন্ধু, কেউ অভিভাবক কেউ বা সহমর্মী। সব টা মিলিয়ে একঝাঁক মানুষ, যাদের সঙ্গ  ছিল উপভোগ করার মত। তার মধ্যে আবার কয়েকজন ছিল যাদের মুক্তি ছিল আকাশে। এদের নিয়ে এক ছোট্ট দল ছিল আমাদের, কোথাও যাদের হারিয়ে যাওয়ার মানা ছিল না। 

                         সেবার অধ্যাপকদের রাজ্যসম্মেলনে গেছিলাম বালুরঘাট। সম্মেলনের অছিলায় নিছক বেড়াতে যাওয়া।  বালুরঘাট থেকে  ইন্দো বাংলাদেশ সীমান্তের হিলি তে। বড় অদ্ভুত এ জায়গায় সীমান্তের বন্টন। হিলি স্টেশনের প্লাটফর্ম পড়ে ভারতে তো রেললাইন বাংলাদেশ। বেশ সুন্দর গ্রাম্য পরিবেশ। আমরা যখন স্টেশনের কাছে পৌঁছলাম তার কিছুক্ষণের মধ্যেই একটা ট্রেন আসবে , বাংলাদেশের ট্রেন। রেললাইনের দুই পাশে দুই দেশ। অসংখ্য মানুষ দাঁড়িয়ে আছে লাইনের দু ধারে। আমরা কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছিলাম না যে ট্রেনে যারা চড়বে তারা প্ল্যাটফর্মে না দাঁড়িয়ে লাইনের পাশে কেন দাঁড়িয়ে আছে! এরপর আকাশ কাঁপানো আওয়াজ করে আসতে লাগল বাংলাদেশের ট্রেন। দূর থেকে ট্রেন আসছে দেখেই হাজার হাজার মানুষ নেমে পড়ল রেললাইনে। চলন্ত ট্রেনের একেবারে সমনে দিয়ে জীবন হাতে করে মানুষ গুলো পৌঁছে গেল একদেশ থেকে আর এক দেশে। সে দৃশ্য দেখে গায়ে যেন কাঁটা দিয়ে উঠেছিল। রেললাইনের দুধারে দুদেশের সীমান্ত রক্ষী বাহিনী নিরূপায় হয়ে দেখতে লাগল মানুষের এই দেশবদল। ট্রেন চলে যাওয়ার পরে যেন যুদ্ধ শেষের নীরবতা। কিছু মানুষের সাথে কথা বলে জানতে পারলাম এই পারাপার নাকি রোজের ঘটনা। চিনি, নুন, চাল, সুতির শাড়ি এ সমস্ত জিনিস দুদেশের মানুষের মাধ্যমে চলে যায় দেশান্তরে। অনেক সময় অনেকে পৌঁছতে না পেরে ধরা পড়ে রক্ষীদের হাতে, কেউ বা ঝাঁপ দেয় পাশের পুকুরে। প্রাণও চলে যায় কখনো বা। কিন্তু ঠিক ট্রেন ঢোকার মুহুর্তে সীমান্ত রক্ষীর চোখ এড়িয়ে পার হতে না পারলে আর পার হওয়ার কোন উপায় নেই মানুষের। বড় অদ্ভুত লেগেছিল ভেবে বছরের পর বছর মানুষ এভাবে কি করে বেঁচে আছে!। কয়েকজন মহিলা কে দেখলাম অনেকগুলো শাড়ি পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে পরে দাঁড়িয়ে আছেন ট্রেন আসার আপেক্ষায়। এভাবেই তাদের সাথে দেশান্তরে যায় সুতির শাড়ি। নিজের চোখে না দেখলে কোনদিন বিশ্বাস করতে পারতাম না।   এভাবেই পারাপারের জীবন কাটায় এই গ্রামের মানুষগুলো। ট্রেন চলে যাওয়ার পর আমরা বেশ কিছুক্ষণ সময় কাটালাম গ্রামের বাচ্ছা গুলোর সঙ্গে। দেখা মিলল দুই সহোদর ভাইয়ের  - একজন রাম আর একজন কবীর। 

                        আজ মনে হয় দিন গুলো যেন স্বপ্ন ছিল। মাথার উপর ছাতার মত থাকা সেই সহযাত্রীরা আজ যে যার বৃত্তে আবদ্ধ। আজও হয়তো সেই ট্রেন আসে, মানুষজন পারাপার করে, কিন্তু রাম আর কবীরের কথা জানতে আর কেউ যায় কি! অজানা অচেনা সীমান্তে নির্ভয়ে হারিয়ে যাওয়ার মন নিয়ে মুক্তির নেশায় ছুটে যায় কি কেউ ? আজও! নির্দ্বিধায় ভরসা করার সেই কাছের মানুষ গুলো আজ যেন কত দূরে। মহামারীর রাক্ষুসে চোখ সবাইকে যেন ছুঁড়ে ফেলেছে ভিন্ন ভিন্ন গ্রহে। পৃথিবীর চেনা ছবিটার সব রঙ ছিনিয়ে নিয়ে ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে সম্পর্কের সব বন্ধন। অনিশ্চয়তার পথে চলতে চলতে, প্রিয় জনকে হারাতে হারাতে একটাই প্রশ্ন মোচড় দিয়ে ওঠে - পথের শেষ কোথায়!



Monday, 25 January 2021

মা যশোদা

             ছোট থেকে বড় হতে হতে অনেক কিছুই  পাল্টে গেল। সবচেয়ে বেশি করে বোধহয় পাল্টে গেলাম আমরা। যে নিবিড় পারিবারিক নির্ভরতা আর নিখাদ স্নেহ ভালোবাসা দিয়ে আমাদের ছোটবেলা কেটেছে, কোথাও গিয়ে যেন সব তালগোল পাকিয়ে গেল। আজ পিছন ফিরে তাকালে স্মৃতির সমুদ্র থেকে উঠে আসে অমূল্য সব সম্পদ, আমাদের জীবনীশক্তির পরশপাথর। এমনই এক সম্পদ আমার বড় মাইমা। জীবনে কোনদিন তাঁকে মাইমা বলে ডাকিনি। মা যেহেতু বৌদি ডাকেন, তাই মাইমা চিরকাল আমারও বৌদি। শুধু ডাকে নয় বৌদিকে বোধহয় কোন কিছুতেই কখনও মায়ের থেকে আলাদা করা যায় নি। মায়ের কাছে গল্প শুনেছি আমার শৈশবের কঠিন অসুখ থেকে সমস্ত রকম বায়না বা আবদার পরম বাৎসল্যের সঙ্গে সামাল দিত বৌদি। মা চোখ বড় করে তাকালে  শাড়ীর খুঁট ধরে বৌদির আড়াল ছিল সবচেয়ে নিশ্চিন্ত আশ্রয়। 


               প্রত্যন্ত গ্রামে মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম হয়েছিল বৌদির। লেখাপড়ার সুযোগ ঠিকমত পেয়ে ওঠার আগেই আমার মামার বাড়ির বিশাল যৌথ পরিবারের বড় বউ হয়ে চলে আসে পাকুড়তলার বিভারাণী। শুরু হয় সংসার সংগ্রাম। দেওর ননদের ভরপুর সংসারে বৌদির ভূমিকা, শরৎবাবুর উপন্যাসের বড় বউ এর থেকে আলাদা কিছু ছিল না। নম্বর ধরে ধরে দেওরদের সম্বোধন করত বৌদি। মেজ, সেজ, ন, ছোট। উচ্চারণে উহ্য থাকলেও দেওর রা বৌদির আপন ভাই এর চেয়ে কম কিছু ছিল না। দেওর ননদের পাছে কষ্ট হয় তাই নিজের বাপের বাড়ির কথা একপ্রকার ভুলেই গিয়েছিল বৌদি। ধীরে ধীরে সমস্ত পরিবারটা সযত্নে নিজের হাতে গুছিয়ে তুলে ক্রমশঃ বৌদি থেকে কখন যেন পরিবারের মা হয়ে গেল বিভারাণী। 

             আমার ছোটবেলা কেটেছে বৌদির শাসন আর স্নেহের এক অদ্ভুত মিশেলের মধ্যে দিয়ে। কোন একটা অন্যায় করে ছুট্টে পালালে পিছন পিছন মিলিটারি মেজাজে ছুটে আসত বৌদি। হাতে গরম খুন্তি আর মুখে একটা অদ্ভুত শব্দ করে বলত - হারামজাদী। এ শব্দের মানে তখন বুঝতাম না। আজ বুঝি  এটা বকুনি নয় নিছক আহ্লাদ। কি যে আনন্দের খেলা ছিল! দুধের চাঁচি থেকে মাছের আঁশ ভাজা, গোল গোল বেগুন ভাজা থেকে মুচমুচে তালের বড়া, আমের মিষ্টি আচার থেকে বড় বড় রসবড়া, যত বায়না সব বৌদির কাছে। গরমের দুপুরে নিয়ম করে লোডশেডিং আর বৌদির হাতের তালপাতার পাখা যেন একে অপরের পরিপূরক। এক মিনিটের জন্যও থামত না সে পাখা। পাছে আমার ঘাম হয়ে সর্দি লাগে। বৌদির ছেলে, মেয়ে আর আমি এই ছিল আমাদের পিঠোপিঠি ভাইবোনের বৃত্ত। কোন একটা কারণে খুনসুটি বাঁধিয়ে ভাইকে বকুনি খাওয়ানোর মজাই ছিল আলাদা। ভাগ্নীর মনোরঞ্জনের জন্য নিজের সন্তানকে শাসন করার মত মা, আজ সত্যিই বিরল। আটপৌরে শাড়ি ছাড়া অন্য কিছু তে দেখলে বৌদিকে চিনতে একটু অসুবিধাই হত। আমার নাছোড়বান্দা স্বভাবের জন্য বৌদির পানের নেশাও কখনও প্রশ্নের মুখে পড়ে যেত। এটা খেলে ওটা হবে এরকম অনেক কিছু বলেও যখন আমাকে জর্দাপানের বায়না থেকে নিরস্ত করা যেত না, তখন চুনের বাটিতে ডুবিয়ে হাতে দিত একটা পানের বোঁটা। সে যেন বিজয় পতাকা। কিছু তো পাওয়া গেল! আমার বাড়ি আর মামার বাড়ির দুরত্ব খুব বেশি ছিল না। তাই ভালমন্দ রান্না হলে আমার ভাগের টা সঠিক সময়ে পৌঁছে দিতে বৌদির যেমন কখনও ভুল হত না, তেমনই কখনও ভুল হত না পাত্রের ঢাকার উপর এক চিমটে নুন দিতে, পাছে কারো নজর লাগে।

               ছোটবেলার এই অভ্যাস বড় হয়েও বদলায় নি। জীবনের সমস্ত ওঠা পড়ায় বৌদি ছিল একান্ত নিবিড় আশ্রয়। কাজের চাপে বৌদির কাছে নিয়মিত যাওয়ার রুটিন বদলে যায়। বৌদির জীবনেও নেমে আসে নানা ঘাত প্রতিঘাত। পরিবারে ঢুকে পড়ে টুকরো হওয়ার কর্কট রোগ। উপর্যুপরী স্বজন হারানোর শোক আর সংসারে ক্রমশঃ বাতিলের দলে চলে যাওয়া বৌদি, ক্রমশঃ অশক্ত হয়ে পড়ে। আমার বাবা মা পছন্দ করতেন না বলে আমার কোন ডাক নাম নেই। কিন্তু সবাই আমাকে যেভাবে দেখে, তার থেকে বৌদির চোখে আমি ছিলাম একটু আলাদা। আমার জন্ম বৃহস্পতিবারে এ কথা সবাই জানে কিন্তু একমাত্র বৌদিই  বোধহয় আমার লক্ষ্মীশ্রীর সন্ধান পেয়েছিল। আমার একটা ডাক নাম হয়েছিল - লক্ষ্মী। জীবনে কোনদিন বৌদি আমাকে আমার পোশাকী নামে ডাকে নি।


                    ২০২০ সালের শেষ দিনে, বছরের বিষের ভার সঙ্গে নিয়ে তেমনই এক বৃহস্পতিবারে আমাদের সকলকে লক্ষ্মীছাড়া করে চলে গেল আমার মামার বাড়ির গৃহলক্ষ্মী। আমার পরম নিশ্চিন্ত আশ্রয় পৌঁছে গেল ঈশ্বরের পরম শান্তির আশ্রয়ে।  আমার মা যশোদা - তুমি খুব ভালো থেকো, শান্তি তে থেকো!




Saturday, 23 January 2021

জবাব

                        পূর্বজন্ম বলে যদি কিছু থাকে তাহলে তার প্রারব্ধ হিসাবে এ জীবনে বেশ কিছু সত্যিকারের মানুষের সান্নিধ্যে আসার সুযোগ আমার হয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম উল্লেখযোগ্য হলেন আমার সঙ্গীতের শিক্ষাগুরু পরমারারাধ্য স্বর্গীয় রামকুমার চট্টোপাধ্যায়। পুরোনো কলকাতা আর বাঙালীয়ানার বিভিন্ন তথ্যের খনি ছিলেন রামকুমার বাবু। ওনার গল্প বলার স্বকীয় ভঙ্গী, ওনার কাছে গান শেখার মতই চিত্তাকর্ষক ছিল আমার কাছে। একটা গল্পের কথা মনে পড়ে গেল আজ।

                           রামকুমার বাবু গানের জগতে খ্যাতি পেয়েছেন বেশ অনেকটা বয়সে। রামনিধি গুপ্ত বা নিধুবাবুর জীবনের উপর তৈরী একটি চলচ্চিত্রে গাওয়া নিধুবাবুর টপ্পা, তাঁঁকে নিয়ে গিয়েছিল খ্যাতির চুড়ায়। দিয়েছিল এক স্বতন্ত্র পরিচিতি। এমনই এক সময়ে যখন তাঁর বেশ নামডাক, তাঁকে গান গাইতে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল কলকাতার একটি বিখ্যাত কলেজের বার্ষিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে। বলা বাহুল্য অধ্যাপকদের পছন্দের শিল্পী হিসাবে আমন্ত্রিত হলেও ছাত্রদের কাছে তিনি খুব একটা গ্রহণযোগ্য ছিলেন না। যা হোক নির্ধারিত সময়ে যথেষ্ট সম্মানের সঙ্গে অনুষ্ঠান স্থলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল তাঁকে। অনুষ্ঠান শুরু হয়, একের পর এক অনুষ্ঠান চলতে থাকে। একের পর এক শিল্পী তাঁদের পরিবেশনা করে যেতে থাকেন। প্রায় ঘন্টা তিনেক বসে থাকার পরেও রামকুমার বাবুর নাম ঘোষণা হয় না। ওনার সঙ্গতকারী শিল্পীরা স্বভাবতঃই বিরক্ত হতে থাকেন। কিঞ্চিত অপমানিতও বটে। কিন্তু গায়ক নিজেই যখন নির্বিকার তথন তাদের আর কিই বা করার আছে! অবশেষে প্রায় রাত দশটা নাগাদ নায়কোচিত ভঙ্গীতে একজন ছাত্র ঘোষণা করেন - ' এখন আপনাদের সামনে নিধিরাম সর্দারের গান শোনাতে আসবেন রামকুমার চট্টোপাধ্যায়'। এমন শ্রীহীন বিকট ঘোষণা শুনে অধ্যাপক রা হায় হায় করে ওঠেন। কিন্তু অনুষ্ঠানের ছন্দোপতন হবার ভয়ে কেউ কিছু বলেন না। সঙ্গতকারী শিল্পীরা একপ্রকার জেহাদ ঘোষণা করেন তাঁরা কিছুতেই মঞ্চে উঠবেন না । রামকুমার বাবু সহাস্যে দর্শকের উদ্দেশ্যে করজোড়ে প্রণাম করে মঞ্চে উঠলেন। দর্শকাসনের পিছন দিকে শুরু হল গুঞ্জন। নড়াচড়া শুরু,  শুরু হল বিক্ষিপ্ত শৃঙ্খলাভঙ্গ। রামকুমার বাবু তাঁর নিজস্ব কায়দায় বাঁ হাত সামনে তুলে উচ্চ কণ্ঠে গান ধরলেন -

 'যমুনায় জল আনতে যাচ্ছ, সঙ্গে নেই তো কেউ - তুমি কাদের কূলের বউ গো তুমি কাদের কূলের বউ'

              দ্রুত লয়, সারেঙ্গীর মোচড় আর চড়া সুরে বাঁধা তবলার বোল। সেই সঙ্গে শিল্পীর সুরের মাদকতায় সমস্ত রঙ্গমঞ্চ মুহুর্তের মধ্যে ফিরে পেল বাঙ্গালীয়ানার ছন্দ। উশখুশ করতে থাকা ছাত্ররা জমিয়ে হেলান দিয়ে বসল মহাজাতি সদনের চেয়ারে। উনি গানটি শেষ করে যখন থামলেন, তখন কিছুক্ষণের জন্য অস্বাভাবিক নীরবতা, যেন ছুঁচ পড়লে শব্দ হবে। কিছু সময় পরে দর্শকাসনের শেষ দিক থেকে ভেসে আসল হাততালির রোল। মুহুর্তের মধ্যে সমস্ত রঙ্গমঞ্চ মেতে উঠল প্রশস্তির কলরোলে। রামকুমার বাবু মাথার উপর হাত তুলে প্রণাম করলেন সমস্ত দর্শককে। মুখের হাসি মুখেই রেখে উঠে পড়লেন। দর্শকরা হই হই করে উঠেছে - আমরা আপনার গান আরও শুনতে চাই। মাইক্রোফোন এর কাছে মুখ এনে এক মুখ হাসি নিয়ে রামকুমার বাবু বললেন - "অনেক রাত হয়েছে তো, আজ নিধিরাম সর্দারের ছুটি। আমি বাড়ি না গেলে বাড়িতে চোর-ডাকাত ঢুকতে পারে, আমায় মার্জনা করবেন।"

           

                  আজ বাংলা মায়ের এক কীর্তিমান সন্তানের জন্মদিবসে আমার দেখা আপাদমস্তক আত্মমর্যাদার মোড়া আর এক বাঙালীর কথা মনে হতেই মনটা ভরে গেল এক অদ্ভুত প্রশান্তিতে। পুরাতনী গানের এই সুরের যাদুকরকে শতকোটি প্রণাম।


                                   🙏 🙏 🙏 🙏

          



Monday, 14 December 2020

কল্যাণীয়া

                        জীবনের বেশ অনেকটা সময় হাওড়া জেলার বেলুড়ে কেটেছে।  রামকৃষ্ণ মিশনের দৌলতে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন হলেও আন্তর্জাতিক মানের পরিকাঠামো পাওয়ার সৌভাগ্য বেলুড়বাসীর বিশেষ হয়নি। ছোটবেলায় যখন শুনেছিলাম কলকাতা যেতে হলে আস্ত একটা নদী পেরোতে হয়, তখন মনে হত কলকাতায় যারা থাকে তারা ভিনগ্রহের বাসিন্দা। এমনই ভিনগ্রহের বাসিন্দা ছিল আমাদের পরিবারের একটি অংশ। আমার বড় জেঠু স্বর্গীয় শ্রী গোপীচাঁদ বন্দ্যোপাধ্যায় এর পরিবার। পরিবারের সবার বড় হিসাবে জেঠু সকলের কাছে একটু বেশি রকমের সম্ভ্রম পেতেন। বাবার কাছে গল্প শুনেছি আমাদের পরিবারে বড় জেঠুর অনেক অবদান। স্বাভাবিক ভাবেই পরিবারের কোন জমায়েতে যখন জেঠু সপরিবারে আসতেন, একটা অন্যরকম পরিবেশ তৈরী হত । একটু বড় হওয়ার পর বাবা বললেন চল জেঠুর বাড়ি নিয়ে যাব। সে তো যেন বিদেশ যাওয়ার আনন্দ। কত কিছু নতুন। হাওড়া স্টেশন, সেখান থেকে দোতলা বাসে চড়া। তখন কলকাতায় মেট্রো চালু হয়নি। জেঠুর চেতলার বাড়িতে যেতে দোতলা বাসে চড়তে হত। বাসের দোতলার একদম সামনের সিটটা পাওয়া যেন দুটো পাখনা পাওয়ার সমান। কি যে আকর্ষণীয় ছিল সেই জেঠুর বাড়ি যাওয়া! জেঠুর বাড়ি পৌঁছে দেখলাম বাড়ির মাথা দেখা যায় না। আমার মত ছোট মানুষ কতটাই বা ঘাড় উঁচু করতে পারে!। বাবা প্রায় আকাশের কাছে একটা বারান্দা দেখিয়ে বললেন ওইটা জেঠুর বাড়ির বারান্দা। আমার স্বতঃস্ফুর্ত প্রশ্ন - কি করে উঠব ? বাবা বললেন চল না দেখবি লিফট চড়াব। পায়ে পায়ে রহস্যভেদ করতে করতে চলেছি বাবার হাত ধরে। বিস্ময়ের পর বিস্ময়। একটা গে্ট লাগানো বাক্সের মধ্যে ঢুকে পড়লাম। টুলে বসে থাকা একজন ভদ্রলোক গেট টা টেনে একটা বোতাম টিপতেই বাক্সটা উপরে উঠতে লাগল। প্রথম ধাক্কায় ভয় পেয়ে বাবার প্যান্ট খিমচে ধরেছি, তারপর দেখলাম বাহ বেশ মজা তো!। একটার পর একটা সিঁড়ি ফেলে কেমন তর তর করে উঠে যাচ্ছে বাক্সটা। সত্যি কলকাতায় থাকার কি মজা!। এরপর থেকে অপেক্ষা করে থাকতাম কবে জেঠুর বাড়ি আসা হবে, আর এই বাক্সটায় চড়ে উপর নীচ করা যাবে। কলকাতায় থাকার সুবাদে আমার জেঠিমা, আমার মা কাকিমাদের থেকে একটু অন্যরকম। জেঠিমার হাঁকডাক, বেলুড়ের মশার সাথে কলকাতার মশার তুলনা,  অসম্ভব ভুল হিন্দি বলার পর দম ফাটানো হাসি আর বেলুড় গাঁঁয়ে থাকি বলে আমাদের প্রতি একটু উপহাস সব মিলিয়ে জেঠিমার বর্ণময়  উপস্থিতি বেশ উপভোগ্য ছিল। 

                          জেঠিমার দিদি ছিলেন সেকালের সাড়া জাগানো অলিম্পিক সার্কাসের মালিক। দক্ষিণেশ্বরে জেঠিমার দিদির বাড়ি যাওয়া ছিল আর এক আকর্ষণ। বাড়িতে ঢুকতেই একটা আস্ত বাঘ দেখে হাড় হিম হয়ে যেত। না সত্যিকারের বাঘ নয়, খড়ের কাঠামোয় সত্যিকারের বাঘের চামড়ার আস্তরণ। কিন্তু এত নিখুঁত যে বাড়িতে ঢুকতে হলে অতি বড় সর্দারকেও একবার থমকে দাঁড়াতে হবে। সেই দিদির বাড়িতে কতগুলো ঘর আছে তার হিসেব বোধহয় তিনি নিজেও জানতেন না। লম্বা বারান্দা দিয়ে বেশ কয়েকটা  ঘর পার হয়ে চলেছি, চারিদিকে দেখছি আর বোঝার চেষ্টা করছি সার্কাসের মালিক হলে ঠিক কতটা বিত্তবান হওয়া যায়।  পায়ে পায়ে অনেকগুলো বেড়াল ছানা ঘুরে বেড়াচ্ছে। অবাক হয়ে জেঠিমা কে বলি বাবা বেড়াল গুলোর কি চেহারা গো! জেঠিমা আমার এই বোকার মত কথায় খুব মজা পায়। ওরে এগুলো বেড়াল নয়, বাঘের বাচ্ছা! বুকের মধ্যে কেউ যেন সজোরে এক ঘুঁষি মারল - বলে কি! একে তো কলকাতাবাসী তায় সার্কাসের মালিকের ঘরের লোক, জেঠিমা যেন আক্ষরিক অর্থেই অধরা। 

                            জীবনের নাগরদোলায় ঘুরতে ঘুরতে জেঠিমার সাথে যোগাযোগ অনেকটাই ফিকে হয়ে গিয়েছিল। কথা প্রসঙ্গে জেঠিমার কথা উঠলেই জেঠিমার সেই চোখমুখ বেঁকিয়ে বলা  - 'ফাস কেলাস' - সকলের কানে বাজত। বারান্দা পরিস্কার করতে গিয়ে পাখিগুলোর সাথে আবোল তাবোল বকতে থাকা জেঠিমার কথা, প্রায়ই ঘুরে ফিরে বেড়াত সকলের মধ্যে। টুকটাক শরীর খারাপের খবর, বয়সজনিত অসুস্থতার খবর মাঝে মাঝেই একজনের থেকে একজনের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ত ফোনে ফোনে। বহু বছর পর জেঠিমার অসুস্থতার খবর পেয়ে গেলাম সেই বাড়িটায়।  বিস্ময়ের আর  কিছু নেই, বরং মলিন হয়ে যাওয়া সেই ঝকঝকে বাড়িটা দেখে মনটা খারাপই হয়ে গেল। অবশেষে দ্বাদশ মাসের দ্বাদশ দিনে ইহলোকের সমস্ত কল্যাণ অকল্যাণের ঊর্ধে চলে গেলেন আমাদের পরিবারের বড় বউমা  - কল্যাণীয়া কল্যানী বন্দ্যোপাধ্যায়। ফাস কেলাস থেকো জেঠিমা।

বদল

                বছরখানেক আগে ইমন  কথা দিয়েছিল বিলাবলকে তার সাথে কখনো পলাশ দেখতে যাবে। সারাবছরের ঘোড়দৌড়ের মধ্যেও সে কথা ভোলেনি ই...