আরাধ্য দেবতা কে পরিবারের সদস্য হিসাবে দেখার রীতি হিন্দুধর্মের অন্যতম নীতিশিক্ষা। আর সেই শিক্ষা থেকেই আমাদের কারো ঘরে মহাদেব, কারো ঘরে কৃষ্ণ, কারো ঘরে নাড়ুগোপাল পূজিত হন পরিবারের সদস্য হিসাবেই। আমাদের যা যা খেতে ভালো লাগে, সেগুলোই তাঁদের নিবেদন করা হয়, আর প্রসাদ হিসাবে আমরা তার আনন্দ উপভোগ করি। পরিবারের আদরের শিশুটির মত করে যত্ন করা হয় তাদের। ঠিক সময়ে তাদের খাবারের ব্যবস্থা করা, ঠিক সময়ে শয়ন। পরিবারের শিশুটিকে যে পোশাকে সুন্দর দেখায়, নাড়ুগোপাল কে সেরকম পোশাক পরানো হয়। পরিবারের শিশুটি যেমন ক্ষুধার্থ থাকতে পারে না তেমনই নাড়ু গোপালকেও কোনওভাবেই ক্ষুধার্থ রাখা যাবে না, এরকম আরও কত কি! নিত্য ব্যবহৃত জিনিস বা খাবার দাবারের মধ্যে আরাধ্যদেবতার অংশ সন্ধান করার প্রচলনও আমরা দেখতে পাই। দেবভজনার বিভিন্ন গ্রন্থে এরকম হাজারো কাহিনীর সন্ধান পাওয়া যায়। মহারাষ্ট্রে ভগবানের উদ্দ্যেশ্যে যে অখন্ড স্তুতি গান প্রচলিত আছে তার নাম অভঙ্গ (Abhang). অভঙ্গ শব্দের অর্থ নিরবিচ্ছিন্ন। মারাঠী দের অন্যতম আরাধ্য দেবতা হলেন বিট্টহোবা পান্ডুরঙ্গ (Bitthoba Panduranga).
এই দেবতা আদতে বিষ্ণুর অবতার রূপে পূজিত হন এবং কৃষ্ণ বর্ণের একজন স্বাস্থ্যবাণ যুবক হিসাবে তাঁর মূর্তি তৈরী করা হয়। প্রধানতঃ বিষ্ণুভক্তরাই পান্ডুরঙ্গের পূজা করে থাকেন। এই দেবতার স্তুতি গান বহু সন্ত এর abhang এ পাওয়া যায়, সন্ত তুকারাম যার অন্যতম। সন্ত তুকারাম তাঁর বিভিন্ন abhang এ বিট্টহল পান্ডুরঙ্গ কে পরিবারের সদস্য হিসাবেই তার স্তুতি গান করেছেন এবং নিত্যব্যবহৃত জিনিসের মধ্যে তাঁর অস্তিত্বের সন্ধান করেছেন।
এমনই একটি abhang এ তিনি কৃষ্ণাবল (Krishnawal) নামক একটি জিনিসের উল্লেখ করেছেন। কিন্তু এমন একটি জিনিসের মধ্যেও যে কৃষ্ণের সন্ধান পাওয়া যেতে পারে এই ভাবনা শুধুমাত্র কোন পরমভক্তের মনেই আসা সম্ভব। কৃষ্ণাবল (Krishnawal) শব্দের অর্থ ভগবান শ্রীকৃষ্ণের প্রতীক। চতুর্বাহু ভগবান বিষ্ণু তাঁর চার হাতে চারটি জিনিস ধারণ করেন - শঙ্খ, চক্র, গদা এবং পদ্ম। এই চার বস্তু একত্রে বিষ্ণুর প্রতীক। কৃষ্ণাবল (Krishnawal) আমাদের রান্নাঘরে থাকা এমন এক বস্তু যার মধ্যে আমরা একত্রে এই চারটি জিনিস দেখতে পারি। ভগবানের প্রতি ভক্তের অনুরাগ কত প্রগাঢ় হলে তবেই সব কিছুর মধ্যে আরাধ্য দেবতার সন্ধান পাওয়া যায় এ বোধহয় তারই নিদর্শন।
কৃষ্ণাবল (Krishnawal) শব্দটির উল্লেখ দক্ষিণের কিছু ভাষা র মধ্যেও পাওয়া যায়। এই শব্দের অর্থ হল - পেঁয়াজ। পেঁয়াজ কে বিভিন্ন ভাবে কাটলে তার মধ্যে ভগবান বিষ্ণুর চারটি অস্ত্রের সন্ধান পাওয়া যায়। লম্বা করে কাটলে শঙ্খ, আড়াআড়ি কাটলে চক্র, গোটা হাতে ধরলে গদামুন্ড এবং ভিতরের স্তর গুলো আলাদা করলে তা পদ্মের আকার পায়।
শঙ্খ
চক্র
এতো গেল শাস্ত্র কথা। এবার আসা যাক ইতিহাসে। হোল্কার সাম্রাজ্যের রাণী অহল্যাবাঈ ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী এবং বুদ্ধিমতী। মল্লার রাও হোল্কার তাঁর দূরদর্শিতার মাধ্যমে অহল্যার মধ্যে প্রচুর সম্ভাবনা দেখেন এবং খুব ছোট্ট বয়সে তাকে পুত্রবধু হিসেবে মালব্য দেশে নিয়ে আসেন। অহল্যাবাঈ ইতিহাস রচনা করার জন্যই জন্মগ্রহণ করেছিলেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর সংসার জীবন ছিল অত্যন্ত কঠিন। সমস্ত প্রচলিত প্রথা কে নতুন করে ভাবা এবং সে সমস্ত প্রথা কে সংস্কার করার অদম্য ইচ্ছা পূরণ করতে অহল্যা কে বহু বাধার সম্মুখীন হতে হয়। মাত্র নয় বছর বয়সে তিনি প্রশ্ন তোলেন স্ত্রী রা কেন শিক্ষার অধিকার পাবে না। এই বয়সের নিতান্ত একজন শিশুর মুখে এমন সমাজ সংস্কারের কথা স্বাভাবিক ভাবেই রাজ পরিবারের কেউ সমর্থন করেন নি। কিন্ত মল্লার রাও অহল্যার শিক্ষার ব্যাপারে অত্যন্ত আগ্রহী ছিলেন কারণ ভবিষ্যতে মালব্য প্রদেশের রাণী হওয়ার সম্ভাবনা তিনি এই ছোট্ট মেয়েটির মধ্যে দেখেছিলেন। নিজেকে শিক্ষাগ্রহণের যোগ্য প্রমাণ করার জন্য, অহল্যাকে রাণী গৌতমার দেওয়া চারটি অত্যন্ত কঠিন প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়েছিল। কৃষ্ণাবল (Krishnawal) ছিল সেই প্রশ্নমালার তৃতীয় প্রশ্ন যা একটি নয় বছরের অক্ষরজ্ঞানহীন বালিকার পক্ষে একেবারেই অসম্ভব ছিল। কিন্তু ছোট্ট অহল্যা তাঁর বুদ্ধিমত্তা দিয়ে এই কঠিন প্রশ্নের সমাধান করেছিলেন এবং ভারতের নারীশিক্ষাকে একটি ঐতিহাসিক স্তরে উন্নীত করতে পেরেছিলেন। আজকের ভারতীয় নারী যে সম্মান, যে অধিকার পেয়ে থাকেন তার এক শক্ত বুনিয়াদ গড়ে দিয়েছিলেন রাণী অহল্যাবাঈ।




কৃষ্ণাওয়াল্ থেকে অহল্যা বাই একই সূত্রে গাঁথা, ইতিহাস, অধ্মাত্যবাদ ও প্রচলিত একটি সবজি
ReplyDelete"Krishnawal "...amar kachhe sompurno notun akta shobdo, ar tar emon ovaboniyo bykhya!!! ...onobodyo..👌
ReplyDeleteShampa
Egulo to kichui jantamna...notun jinish jablam....peyaz er modhye sankha chakra goda podmo...Ar ekhane peyaz amish...It is all a matter of perception...
ReplyDeleteKrishnawal (peyanj) er modhye ishwar er sandhan khunje paowa sotti i adhyatmik chetonar ek ononyo prokash...🙏🙏🙏
ReplyDeleteSuman
সব্জি ই বলি বা মশলাই বলি, পেঁয়াজের মধ্যে ভগবান কৃষ্ণের হাতের চার আয়ুধ কে খুঁজে পাওয়ার মধ্যে আছে এক অসীম গভীরতার আধ্যাত্মিক কল্পনাশক্তি !
ReplyDeleteঠিক যেমন আকাশে মেঘ দেখে মনে তুলনা আসে বিভিন্ন কাল্পনিক আকৃতির!
মজার ব্যাপার হল সেই ছোট থেকে উদ্ভিদ হওয়া স্বত্ত্বে আমিষ তকমা পাওয়া বেচারী পেঁয়াজের বৃহত্তর ভারতীয় এমন নামের কথা জানিই না।
অথচ উদ্ভিদবিদ্যার প্রারম্ভিক পাঠে ছেলেমেয়েদের আমরা অণুবীক্ষণে কোষ চেনাই এই Allium cepa বা পেঁয়াজের শল্কপত্র থেকে। পেঁয়াজের মূল ও কলি থেকে ছাত্রছাত্রীরা পাঠ নেয় কোষবিভাজন ও ক্রোমোজম এর। এত বিশদভাবে দীর্ঘদিন র্পেঁয়াজের ক্রমাগত ব্যবচ্ছেদ করা স্বত্ত্বেও সুদূরতম কল্পনায় এর কৃষ্ণাবল রূপ আমাদের কারো মনে হয়নি, যেটি বালিকা অহল্যাবাই অবলীলায় বলে দিতে পেরেছিলেন। অসাধারণ মেধা ও কল্পনার অধিকারী এই মহীয়সী নারী আমাদের প্রণম্য।
অসাধারণ লেখা টি পড়ে জ্ঞান ও মননে ঋদ্ধ হলাম৷
এমনভাবে সত্যি কোনোদিন ভাবিনি। আজ এই লেখাটি পড়ে মনের একটা দরজা খুলে গেল। ঈশ্বরকে ভালবাসলে এমনভাবেই বোধহয় সংসারের সব কিছুর মধ্যেই ঈশ্বরকে উপলব্ধি করা যায়। লেখাটি পড়ে সমৃদ্ধ হলাম।
ReplyDeleteমহুয়া
Anek ajana tothyo...samridho holam🙏🙏🙏
ReplyDeleteAsadharan, sadhu...sadhu... Krishnawal samporke jene, aaro janar ichche jagroto hochche.
ReplyDeleteঅসাধারন। ভাবনা-চিন্তার বাইরে। মনের ভক্তি কোন পর্যায়ে গেলে এ সম্ভব।
ReplyDeleteচম ৎকার
ReplyDeleteঅপূর্ব
ReplyDelete