একই ছন্দে চলতে থাকা জীবনটায় মাঝে মাঝে কিছু কিছু বিষয় কেমন যেন ঝাঁকুনি দিয়ে যায়। প্রতিদিনই কাগজ পড়ি। রবিবারের কাগজে বিশেষ কোন লেখা থাকলে তা বেশ মন দিয়েও পড়ি। কিন্তু এই লেখাটা কেমন যেন নাড়িয়ে দিয়ে গেল। লেখাটার প্রতিটা লাইন যেন আমাকে প্রশ্ন করে গেল - নিজেকে খুঁজে পেলে? চারিদিক থেকে ভেসে আসা অনেক রকম সুর কানের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় জিজ্ঞাসা করে গেল - চিনতে পারো আমায়? বর্তমান যুগের গান আর তাতে ব্যবহার করা বাদ্যযন্ত্রের উপর কিছু বিষয় নিয়ে এই প্রবন্ধ। তাতে প্রধানতঃ হারমোনিয়ামের ব্যবহার আর তার ঐতিহাসিক পটভূমির উপর বিস্তারিত আলোচনা। আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একজন প্রখ্যাত শিল্পীর ব্যবহার করা একটি হারমোনিয়াম আর সেই হারমোনিয়ামের সাথে জড়িয়ে থাকা সেই শিল্পীর আবেগ। শিল্পী পুরাতনী বাংলা গানের যাদুকর রামকুমার চট্টোপাধ্যায়। তিনি রোমন্থন করেছেন তাঁর প্রিয় হারমোনিয়ামের স্মৃতি। এই হারমোনিয়াম বাংলা গানের এক সম্পদ। কলকাতার নামজাদা হারমোনিয়াম প্রস্তুতকারক শরৎ চন্দ্র সর্দার মহাশয়ের নিজের হাতে তৈরী এই হারমোনিয়াম। রামকুমার বাবু এই হারমোনিয়ামের বিষয়ে এতটাই আবেগপ্রবণ যে তিনি এই হারমোনিয়াম কোনদিন টিউনিং করাননি পাছে শরৎ চন্দ্র সর্দার মহাশয়ের বেঁধে দেওয়া সুর কোনভাবে বিকৃত হয়। হারমোনিয়ামটার ছবি দেখে আমার মনের ঘড়ির কাঁটা উলটো দিকে ঘুরতে শুরু করল। ।
Saturday, 26 June 2021
টিউনিং
এই হারমোনিয়ামের সঙ্গে আমার পরিচয় ১৯৮৮ সালে। সুগমসঙ্গীতে কিছুটা তালিম নেওয়ার পর একটু অন্য ধরণের গান বাজনার তালিম নেওয়ার স্বপ্ন জেগেছিল মনে। কিন্তু তেমন কোন গুরুর সান্নিধ্য পাওয়া বড় সহজ ছিল না। আমার বড়দাদু (বাবার বড় মামা) তারু মূখার্জ্জী মহাশয় তৎকালীন বাংলা সিনেমা জগতের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সিনেমা পাড়ায় যাতায়াতের সুবাদে বেশ কিছু নামজাদা মানুষের সাথে পরিচয় ছিল তাঁর। একদিন কথা প্রসঙ্গে আমাকে বললেন পুরাতনী গান শিখবি? আমার তখন এ ধরণের গান সম্পর্কে বিশেষ ধারণা নেই। তবে রামকুমার চট্টোপাধ্যায়ের নামের সাথে অল্পবিস্তর পরিচয় ছিল। বড়দাদু বললেন ঠিক আছে আমি নিয়ে যাব তোকে। পুরাতনী গান সম্পর্কে আমার জ্ঞান তখন এতটাই সীমিত, যে যাবার কথা শুনে বিশেষ আনন্দিত হই নি। বরং একেবারে নিশ্চিত ছিলাম দাদু যদি আমাকে নিয়ে গিয়ে রামকুমারবাবুর কাছে হাজির ও করেন, উনি আমাকে গান শেখাতে রাজী হবেন না। অবশেষে কোন এক রবিবারে বাবা, আমি আর বড়দাদু বাঁধাঘাট থেকে ফেরীতে চড়ে বসলাম আহিরীটোলা যাবার উদ্দেশ্যে। ফেরী চড়ে সেই প্রথমবার গঙ্গা পার হওয়া। আহিরীটোলা ঘাটে নেমে তিনজনে গল্প করতে করতে হেঁটে চলেছি। উত্তর কলকাতার গলি রাস্তা, বাবা চিনিয়ে নিয়ে চলেছে কোথায় কোথায় কলকাতার বড় বড় দূর্গাপূজা হয়। বেশ অনেকটা রাস্তা চড়া রোদে হেঁটে পৌঁছলাম একেবারে সংকীর্ণ একটা গলিতে। ৫ নম্বর তারক চ্যাটার্জ্জী লেন। বাড়ির সদর দরজাটা এত নীচু, একজন সাধারণ উচ্চতার মানুষ সোজা হয়ে ঢুকতে পারেন না। দরজা দিয়ে ঢুকেই ছোট্ট একটা উঠোন। সেই উঠোনের চারিদিক ঘিরে বেশ কয়েকটা ঘর। একেবারে সোজা যে ঘরটা দেখা যাচ্ছে, সেটা বোধহয় বাড়ির সবচেয়ে ছোট্ট একটা কুঠুরী। এই কুঠুরীই আসলে সঙ্গীতের এই যাদুকরের সাধনক্ষেত্র। বড়দাদু ভিতরে ঢুকলেন। আমি আর বাবা বাইরে অপেক্ষা করছি। আটপৌরে পোশাকে চেয়ারে বসে আছেন রামকুমার চট্টোপাধ্যায়। একেবারে বৈঠকী মেজাজে। বড়দাদু কি বললেন জানিনা, কিন্তু আমার কানে একটাই কথা ভেসে এল। একটু সরু সুরেলা কন্ঠে রামকুমার বাবু বলছেন - আপনি কি পাগল হয়েছেন! এই টুকু মেয়েকে আমি কি শেখাব? আমি একটুও কষ্ট পেলাম না। আমি এর জন্য মানসিক ভাবে প্রস্তুত ছিলাম। আমার সঙ্গীত শিক্ষা সত্যিই পুরাতনী বাংলা গান বা টপ্পা গান আয়ত্ত করার মত পরিণত নয়। বড়দাদু নাছোড়বান্দা। বললেন আমি মেয়েটাকে বড় মুখ করে বললাম আর আপনি ওকে ফিরিয়ে দেবেন? রামকুমার বাবু মুখটা ঘুরিয়ে আমার দিকে তাকালেন। কি জানি আমাকে দেখে বোধহয় একটু মায়া হল তাঁর। বড়দাদু কে বললেন - আমি আগে ওর গান শুনব তারপর দেখা যাবে। হাতের ইশারায় আমাকে বললেন - ভিতরে এস। গানের ঘরটি এতই ছোট যে আমাকে ঢুকতে হলে বড়দাদুকে বেরিয়ে আসতে হবে। আমি ঘরে ঢুকে ওনাকে প্রণাম করব বলে নীচু হতেই উনি আমাকে বললেন - সাবধান কুকুর আছে। উনি যে চেয়ারে বসে আছেন তার ঠিক নীচে লুঙ্গির আড়ালে শুয়ে আছে একটা লোমওয়ালা কুকুর। রামকুমার বাবুর খুব আদরের।
রামকুমার চট্টোপাধ্যায় ও তাঁর হারমোনিয়াম
গোল শ্বেতপাথরের টেবিল টা পার হয়ে উলটো দিকের বসার জায়গাটা তে বসলাম। এবার বুকটা একটু ঢিপ ঢিপ করছে। ভয়টা দ্বিগুণ হয়ে গেল বাইরে বসে থাকা বাবার মুখটা দেখে। যদি উনি ফিরিয়ে দেন, তাহলে কি হবে কে জানে। বড়দাদুর প্রস্তাব শোনার পর থেকেই ক্যাসেট শুনে রামকুমার বাবুর কয়েকটি টপ্পা গান একটু রপ্ত করার চেষ্টা করেছিলাম। এছাড়া আমার ঝুলিতে আর কোন অস্ত্র নেই। এই অস্ত্র দিয়ে এই অসম লড়াই কিভাবে লড়ব এই সব ভাবতে ভাবতে রামকুমারবাবু আমার দিকে ঘুরিয়ে দিলেন হারমোনিয়াম। বললেন কোন স্কেল? আমি বললাম। ছাপোষা মধ্যবিত্ত পরিবারের বাবা মায়ের সন্তান, বাবা মায়ের শখে গান শেখা। Scale changing হারমোনিয়াম এ গান গাইবার সৌভাগ্য হয় নি কখনো। উনি সস্নেহে হারমোনিয়ামটিতে আমার স্কেল বেঁধে দিলেন। বল দেখি কি গান শিখেছ? আমার বুকের ভিতরটা একেবারে হালকা হয়ে গেছে। সুর বেরোবে কিনা আমি জানিনা। হারমোনিয়ামটা বাজাতে শুরু করলাম। ভয়ে চোখ বুঁজে গিয়েছে। ক্যাসেট শুনে অনেক কষ্টে রপ্ত করা একটা গান - দেখা হলে ননদিরে বোল - গাইবার প্রাণপণ চেষ্টা করলাম। একলাইন গাইবার পর মুখ চোখ বিকৃত করে রামকুমার বাবু বললেন - থামো। আমি বুঝলাম আমার সব আশা শেষ। উনি বললেন - ভজন শিখেছ কোন? গাও দেখি! বুঝলাম আমার গলায় নিজের গান শুনে যারপরনাই বিরক্ত হয়েছেন উনি। সব গুলিয়ে গিয়ে কিছুই মনে পড়ছে না। অনেক কষ্টে একটা সুরদাসের ভজন মনে পড়ল, গাইলাম। কিন্তু ঐ এক লাইন। আবার থেমে যেতে হল। এবার বললেন ভক্তিগীতি জানো? এবার আমার চোখে জল শুধু পড়তে বাকি আছে। বাইরে বসে আছে বাবা। একবার চোখ পড়তেই দেখলাম চোয়াল দুটো শক্ত করে বসে আছে দুজনেই। আমার যেন মনে হল এই ভক্তিগীতি আমাকে সমস্ত শক্তি দিয়ে গাইতে হবে। আমি গান ধরলাম -
শ্মশান ভালোবাসিস বলে শ্মশান করেছি হৃদি
শ্মশানবাসিনী শ্যামা আসবি বলে নিরবধি
এবার দুলাইন শোনানোর সুযোগ মিলল। থেমে গেছে আমার গান। আমি মাথা নীচু করে বসে আছি। চারিদিকে যেন শ্মশানের নীরবতা। শুধু লোমওয়ালা কুকুরটা খাঁউ খাঁউ করে যাচ্ছে। রামকুমারবাবুর শ্বেতপাথরের টেবিলের উপর একটা বড় কাঁচের গ্লাসে একগ্লাস লাল চা আর একটা ডালডার কৌটোয় বিস্কুট। কি যেন ভাবতে ভাবতে বেশ কয়েক চুমুক চা খেয়ে ফেললেন। আর তর সইল না বড়দাদুর। উঠে এসে জিজ্ঞাসা করলেন রামবাবু কি বুঝলেন? খুব রাগী চোখে বড়দাদুর দিকে তাকালেন। আমি যেন শুনতে পাচ্ছি উনি বলছেন - আমি তো আগেই আপনাকে বললাম ----। দুধের মত সাদা চুলের মধ্যে গোলাপ ফুলের পাপড়ির মত আঙ্গুল গুলো চালাতে চালাতে গম্ভীর স্বরে বললেন - রবিবার করে পাঠিয়ে দেবেন, আমি শেখাব। অনেকক্ষণ ধরে আঁটকে থাকা চোখের জলের ফোঁটাটা এবার পড়েই গেল এই হারমোনিয়ামের উপর আর আমার জীবনের একটা বড় অধ্যায় হিসাবে সেই দিন থেকে রয়ে গেল শরৎ চন্দ্র সর্দারের নিজের হাতে তৈরী সেই হারমোনিয়াম। আমার গানের জগৎটারও এই হারমোনিয়ামের মত স্থায়ী টিউনিং হয়ে গেল।
Subscribe to:
Post Comments (Atom)
বদল
বছরখানেক আগে ইমন কথা দিয়েছিল বিলাবলকে তার সাথে কখনো পলাশ দেখতে যাবে। সারাবছরের ঘোড়দৌড়ের মধ্যেও সে কথা ভোলেনি ই...


এই মুখ দুটি বড়ই চেনা। এ এক অনন্য অভিজ্ঞতা
ReplyDeleteAkjon guuni manush e arekjon prokrito guuni manush ke thik chiney nen...e tar e golpo. Dhonyo apnar sangeet shiksha. Emon Guru ke amat Pronam janai 🙏🙏.. Bohu guun er odhikarini apni, evabei somridhho korun amader. Khub bhalo laglo.
ReplyDeleteShampa
সত্যি, জীবনের এই টিউনিং এর অমূল্য অভিজ্ঞতা কজনের ভাগ্যে জোটে!
ReplyDeleteরবিবারের লেখাটা পড়েই কেমন যেন মনে হচ্ছিল,এটি হয়তো কারও স্মৃতিকে দোলা দিয়ে যাবে।
সেই জন্যই এই সুন্দর লেখাটি পাওয়া গেল, একজন প্রকৃত গুরুর সুযোগ্য সংবেদনশীল শিষ্যার লেখনী থেকে।
Ekjon mohan guru dwara ek prokrito protibha r choyon... osadharon nostalgic ek kahini... Timeless tuning🙏🙏🙏
ReplyDeleteSuman
খুব ভাল লাগল।তোমার গান কিন্তু অনেক দিন শুনিনি।
ReplyDeletePratham jedin apnar ganer gala sunechilam, r je gaan apni geyechilen, means apnar selection of song, bujhiye diyechilo, kotota unusual.Apni je guru r kache talim neowar sujog peyechen, sashradha pranam apnader.
ReplyDeleteবন্ধু আপনার পরিচয় পেলে ভাল লাগত
DeleteBaro anonder avigyota...ki sundor gaan aapni...Gurur ashirbad🙏🙏🙏
ReplyDeleteApnar personal experience er modhye diye arekjon guni shilpi r songey o personal porichoy hoye gelo. Chobi gulo jeno kotha bole
ReplyDeleteকেমন একটা অন্য রকম অনুভূতি হচ্ছে লেখা টা পড়ে। ভালো লাগা আরে সেই সঙ্গে মন খারাপ করা একটা ভাব। সত্যিই জীবনের টিউনিং যে কার কোথায় লেখা থাকে, কে জানে। তবে আপনার ছোটবেলার ছবি টা দেখে ভালো লাগল।
ReplyDelete